• বুধবার   ১৪ এপ্রিল ২০২১ ||

  • বৈশাখ ১ ১৪২৮

  • || ০২ রমজান ১৪৪২

খামারি বেশি দেখিয়ে ৪ কোটি টাকা লুট

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ৬ মার্চ ২০২১  

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ‘আধুনিক প্রযুক্তিতে গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ প্রকল্পে’ ২০১৯-২০ অর্থবছরে খামারির সংখ্যা চারগুণ বেশি দেখিয়ে প্রায় পৌনে ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ৪৯১টি উপজেলায় প্রশিক্ষণ ভাতা, প্রশিক্ষণার্থীদের খাবার, গবাদিপশুর ভিটামিন, ভ্যাকসিন, কৃমিনাশক ট্যাবলেট, হেলথ কার্ড, বুকলেট বিতরণ ও প্রকল্পের আসবাবপত্র-সরঞ্জামাদি ক্রয়ে এ অনিয়ম করা হয়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে তিন বছরের মেয়াদে একনেকে ৪১ কোটি ২২ লাখ ৮৭ হাজার টাকা বরাদ্দে আধুনিক প্রযুক্তিতে গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ প্রকল্পটি পাশ হয়। প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রাণিজ আমিষের সরবরাহ নিশ্চিত করে উৎপাদন পদ্ধতি নিরাপদ করা, প্রান্তিক পর্যায়ে খামারিদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দারিদ্র্র বিমোচন করার লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় খামারিদের প্রশিক্ষণ শেষে বিনা মূল্যে গবাদিপশুর ভিটামিন, ভ্যাকসিন, কৃমিনাশক ট্যাবলেট ও খামারিদের জন্য প্রশিক্ষণ ভাতা, প্রশিক্ষণার্থীদের খাবার, হেলথ কার্ড ও বুকলেট দেয়ার কথা।

সূত্র জানায়, ৪৯১টি উপজেলায় প্রশিক্ষণার্থীর ৩৬ হাজার ৮২৫ জন সুবিধাভোগী খামারির তালিকা তৈরি করা হয়। কিন্তু মূলত প্রতি উপজেলায় ২০ জন করে ৪৯১টি উপজেলায় ৯ হাজার ৮২০ জন খামারিকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৪ গুণ বেশি দেখিয়ে ২৭ হাজার ৫ জন খামারির প্রশিক্ষণ ভাতা ২৫০ টাকা হারে ৬৭ লাখ ৫১ হাজার ২৫০ টাকা, দুপুরে খাবার ২০০ টাকা হারে ৫৪ লাখ এক হাজার টাকা, গবাদি পশুর জন্য কৃমিনাশক ট্যাবলেট বাবদ ১৭ লাখ ৬৯ হাজার ২৩০ টাকা, ভিটামিন মিনারেল প্রিমিক্স মিক্স পাউডার বাবদ ২ কোটি ১৮ লাখ ৭২ হাজার ৪১৫ টাকা, হেলথ কার্ড বাবদ ৪ লাখ ৩০ হাজার ১৯৯ টাকা ও বুকলেট বাবদ ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯৪৮ টাকা। মোট ৩ কোটি ৬৬ লাখ ১ হাজার ৪২ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। প্রশিক্ষণের অংশ নেওয়া ঢাকার ধামরাই উপজেলার শরীফবাগ এলাকার এমএ ফারুক বলেন, আলোচনা শেষে আমাদের একটি কমলা আর একটি কুল বরই দেয়া হয়। কোনো ভাতা, ভ্যাকসিন, মেডিসিন কিছুই পাইনি।

সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের কাকাবো এলাকার তরিকুল্লা ও তার স্ত্রী হোসনেয়ারা একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিলেও কোনো ধরনের সরকারি সুবিধা পাননি বলে জানান। এ বিষয়ে সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সাজেদুল ইসলাম  বলেন, সুবিধাভোগীর এ তালিকা ভুয়া। গত বছরের খামারিদের তালিকায় ত্রুটির বিষয়ে স্বীকার করে প্রকল্প পরিচালক ডা. প্রাণকৃষ্ণ হাওলাদার  বলেন, আগামীতে এ তালিকা সংশোধন করে প্রকল্পটি নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনা করা হবে। বগুড়া জেলার সোনাতলা উপজেলায় ১২৫ জন সুবিধাভোগী খামারির তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এতে গোপাই শাহাবাজপুর এলাকার আশরাফুল ইসলামের নাম রয়েছে। যোগাযোগ করা হলে আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমি কোনো প্রশিক্ষণে অংশ নেইনি। ওই তালিকায় আমার নাম আসার কথা নয়।

সূত্র জানায়, ৭৫ হাজার ২৯৫ কেজি ভিটামিন মিনারেল প্রিমিক্স মিক্স পাউডার সরবরাহে মাহিয়ান বিল্ডার্স নামক প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। প্রতি কেজি ৩৯৩ টাকা মূল্য ধরে মোট ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার ৯৩৫ টাকা। মালামাল সরবরাহ না করলেও প্রতিষ্ঠানটির নামে কয়েক দফা চেক ইস্যু করা হয়।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, এর আগেও মাহিয়ান বিল্ডার্স মালামাল সরবরাহ না করে মহিষ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করে। এ ঘটনায় প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি দুই বছরের জন্য সব ধরনের ক্রয় কার্যক্রম থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে অযোগ্য ঘোষণা করে।

ভিটামিন সরবরাহ না করে চেক গ্রহণের বিষয়ে মাহিয়ান বিল্ডার্সের প্রতিষ্ঠাতা বাবুল হোসেন বলেন, মালামাল সরবরাহ না করে প্রকল্প থেকে বিল উত্তোলনের অভিযোগ ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক।

অনিয়মের বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে না পেয়ে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবরে লিখিত মন্তব্য চাওয়া হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবদুল জব্বার শিকদার মোবাইল ফোনে বলেন, অনিয়মের বিষয়টি আপনার (প্রতিবেদক) পত্রের মাধ্যমে জানতে পেরেছি। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।