• বৃহস্পতিবার   ১৫ এপ্রিল ২০২১ ||

  • বৈশাখ ২ ১৪২৮

  • || ০৩ রমজান ১৪৪২

জাতীয় পর্যায়ের জয়িতা হলেন সেই রবিজান

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ৮ মার্চ ২০২১  

‘স্বাধীনতার পর কেউ আমাকে নিয়ে চিন্তা করেনি। মির্জাপুরের সাংবাদিকরা আমারে নিয়ে সংবাদ লেখার কারণে সরকার আমার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় দিয়েছেন। আজকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে পুরস্কার দেয়ার জন্য ডেকেছেন। আমি সাংবাদিক ও শেখ হাসিনাকে প্রাণভরে দোয়া করি। আল্লাহ যেন সবাইকে ভালো রাখেন।’


কথাগুলো বলছিলেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাঁশতৈল ইউনিয়নের বীরঙ্গনা রবিজান বেওয়া। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করায় এ বছর জাতীয় পর্যায়ে ঢাকা বিভাগে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। তিনি বাঁশতৈল ইউনিয়নের বাঁশতৈল পশ্চিমপাড়া গ্রামের হারাদন আলীর মেয়ে।


৮ মার্চ সোমবার আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পাঁচজন জয়িতাকে এক লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সনদ দেয়া হয়। এদের মধ্যে মির্জাপুরের বীরাঙ্গনা রবিজান একজন।

জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী রবিজান বেওয়ার গ্রামে ঢুকে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বিএসসিসহ আরও কয়েকজনের বাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। ওইদিনই পাক বাহিনীর সদস্যরা বাড়িতে ঢুকে অস্ত্রের মুখে রবিজানসহ আরও কয়েকজন নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। অস্ত্রের ভয় আর পাশবিক নির্যাতনে জ্ঞান হারান তিনি।

ধর্ষিতা হওয়ার অপরাধে স্বামীর সংসার ছাড়তে হয় তাকে। সরকারি জমিতে ঘর তুলে বসবাস করতে থাকেন তিনি। বয়স হওয়ায় এখন কানেও শোনেন না তেমন, স্মৃতিশক্তিও কমে গেছে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি দেয়া হয়নি রবিজানকে। পাননি বয়স্ক বা বিধবা ভাতা বা সরকারি কোনো সযোগ-সুবিধাও। উল্টো পেয়েছেন মানুষের লাঞ্ছনা, ঘৃণা ও অপবাদ।


প্রকাশিত সংবাদ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারীর নজরে আসে। তিনি টাঙ্গাইলের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. মাহাবুব হোসেনকে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন। দীর্ঘ যাচাই বাছাই শেষে ২০১৯ সালের জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৬২তম সভায় ৯ জুলাই রবিজান বেওয়াসহ সারাদেশে ৪৬ জন বীরাঙ্গনার নাম প্রকাশ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। যা ২৯ জুলাই গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।

২০১৯ সালের ২৯ আগস্ট ‘এতদিনে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন বীরাঙ্গনা রবিজান’ শিরোনামে আরও একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। একই বছর ১৫ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে রবিজানকে মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতার ৮২ হাজার টাকার চেক দেয়া হয়।

এছাড়া গত বছর রমজান মাসে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জোবায়ের হোসেন বীরাঙ্গনা রবিজানকে সরকারি ৮ শতাংশ ভূমি লিখে দখল বুঝে দেন।

রবিজান বলেন, সাংবাদিকরা আমাকে নিয়ে লেখার কারণে দীর্ঘদিন পর হলেও বীরাঙ্গনা খেতাব, সম্মানী ভাতা ও সরকারি জমি পেয়েছি। আজ শেখ হাসিনা আমাকে পুরস্কার দিলেন। এজন্য আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মির্জাপুরের সাংবাদিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

মির্জাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জোবায়ের হোসেন বলেন, গেজেট প্রকাশের দিন থেকে তার নামে ভাতা চালু হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সরকারি ৮ শতাংশ ভূমি লিখে ও দখল বুঝে দেয়া হয়েছে। এছাড়া সরকারিভাবে তাকে ঘর দেয়ার প্রস্তুতি চলছে।