• সোমবার   ০৮ মার্চ ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ২৪ ১৪২৭

  • || ২৪ রজব ১৪৪২

দেশ ও জাতির স্বপ্ন সম্ভবের পদ্মা সেতু

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ২০ ডিসেম্বর ২০২০  

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবন বাজি রেখে বাঙালীকে এনে দিয়েছেন মুক্তি-স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শ্রাবণের মেঘলা ভোরে ঘাতকের হাতে সপরিবারে শহীদ হওয়ার ক্ষণ পর্যন্ত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বাঙালী চিন্তা করেছেন তাঁর সন্তানতুল্য দেশ ও দেশের মানুষ নিয়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সূর্য অধরা থেকে যেত। বাংলাদেশের যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি স্বাধীনতা অর্জিত না হলে তা সম্ভব হতো না। বাংলাদেশের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অধিকারের ভিত্তি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পত্তনের শেকড় নিহিত রয়েছে শেখ মুজিবুর রহমান নামের ভেতরে। অদম্য বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন-প্রগতির মহাসড়কে দাপটের সঙ্গে পথ চলতে শুরু করেছে তাঁরই কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে।

বঙ্গবন্ধুর একটি ঘোষণা খুব তাৎপর্যপূর্ণ- দাবায়ে রাখতে পারবা না। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের ইশতেহার এই ঘোষণার মধ্যে নিহিত। বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বভাবসুলভ ভাষায় তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীসহ পৃথিবীর মানুষকে জানিয়ে দিয়েছেন, এদেশের মানুষকে আটকে রাখা যাবে না। কারও বন্দীশালায় বন্দী থাকার জন্য বাঙালীর জন্ম হয়নি; যা জাতির জনকের ঘোষণার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে। একথা সত্য যে, জাতির পিতাকে হারিয়ে বাঙালী বহু বছর দিকভ্রান্তের মতো ঘুরেছে। খুঁজে ফিরেছে পিতার উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা। পিতাহীন দীর্ঘ সময়ে বাঙালীকে পিছিয়ে দিতে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে দেশে-বিদেশে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ঘুচতে শুরু করে পুরনো ক্ষত। যে ইশতেহারকে সামনে রেখে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, সেই পথে দেশ ফিরেছে শেখ হাসিনার হাত ধরে।

ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে সম্মানের আসনে আসীন করেছেন। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, বেড়েছে সার্বিক জীবনমান। জাতিসংঘ স্বীকৃত মৌলিক অধিকারসমূহের পূর্ণতাদানে রাষ্ট্র বিরামহীন কাজ করে চলেছে। টানা তিন মেয়াদে সরকার গঠন করে শেখ হাসিনা একদিকে যেমন দক্ষ সংগঠক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন তেমনি দেশবিরোধী সকল শক্তিকে রুখে দিতে তাঁর শক্তি সংহত হয়েছে। বাংলাদেশের সামনে এখন সুন্দর সময় অপেক্ষমাণ। ২০২১ সাল মুজিব জন্মশতবর্ষের কাল। বাংলাদেশে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন হচ্ছে এ বছর। বাংলাদেশের উৎসবের কালে বাঙালীর জন্য উপহার হিসেবে পদ্মায় গড়ে উঠছে স্বপ্নের সেতু।

প্রমত্তা পদ্মায় গড়ে উঠছে বিস্ময়

অনেক চড়াই-উতরাই শেষে নিজস্ব অর্থায়নে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয় পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ। ২০১৭ সালে সেপ্টেম্বর মাসের শেষদিকে পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান বসানোর কাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে সকল স্প্যান বসানোর কাজ সমাপ্ত। ৩০,১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে প্রকল্পটি। পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ২০২২ সালের জুন মাসের পরে গণমানুষের জন্য উন্মুক্ত হবে পদ্মা সেতু। একই সঙ্গে বাস ও ট্রেন চলতে সক্ষম দ্বিতল এই সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। কংক্রিট ও স্টীল দিয়ে নির্মাণাধীন এই সেতু নির্মাণ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। আর নদীশাসনের কাজ সিনো হাইড্রো কর্পোরেশন।

দুর্নীতির কথিত অভিযোগে অর্থায়ন বন্ধ

দেশের মানুষের অর্থায়নে প্রমত্তা পদ্মায় যে সেতু গড়ে উঠছে শুরুতে সে প্রকল্পে একটি বড় অর্থায়ন করার কথা ছিল বিশ^ব্যাংক ও কয়েকটি বিদেশী উন্নয়ন সংস্থার। তখন এই প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার কোটি টাকা। মোট অঙ্কের ভেতরে বিশ^ব্যাংক একাই অর্থায়ন করতে চেয়েছিল ১২০ কোটি মার্কিন ডলার। বাকি অর্থ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক, জাপানী উন্নয়ন সংস্থা জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের জোগান দেয়ার কথা ছিল। দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ায় অন্যান্য বিদেশী দাতাসংস্থাও প্রকল্পটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

নিজস্ব অর্থায়ন

বিশ্বব্যাংক ঋণসহায়তা দেবে না এমন ঘোষণার পরও বাংলাদেশের তরফে যোগাযোগ রক্ষা করা হয় যেন সংস্থাটি তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে। পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাংক ও সরকারের মাঝে নানা আলোচনার একপর্যায়ে বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ সহায়তা না নেয়ার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণ করা হবে বলে জাতীয় সংসদে ঘোষণা দেন। এ লক্ষ্যে তিনি দেশের মানুষ ও প্রবাসীদের সহযোগিতা করার জন্য আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের প্রেক্ষিতে শুরু হয় অর্থ সংগ্রহ। সব মন্ত্রী এক মাসের সম্মানী জমা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সচিবরাও দেন একটি উৎসব ভাতার সমপরিমাণ অর্থ। এভাবে চলতে থাকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজ। বিশ্বব্যাংকের টালবাহানার প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারি পদ্মা সেতুর জন্য অর্থায়নের অনুরোধ প্রত্যাহার করে বিশ্বব্যাংককে চিঠি দেয় সরকার। অনুরোধ প্রত্যাহারের পর চীন-মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশের নাম আসতে থাকে পদ্মা সেতু অর্থায়ন ইস্যুতে। তবে সেসব প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য লাভজনক না হওয়ায় নিজস্ব অর্থায়নে শুরু হয় এই মেগা প্রকল্পের কাজ। ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করে দেশের মানুষের বহু কাক্সিক্ষত স্বপ্ন।

মিথ্যা অভিযোগ ও বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র

পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক যে কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছিল প্রকৃত অর্থে সে অভিযোগের কোন ভিত্তি ছিল না। তবু সরকার বিশ্বব্যাংকের শর্ত মেনে প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্তের বিষয়ে একমত হয়। আলোচিত প্রকল্পে কথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে কারা অভিযুক্ত হবেন, তা নিয়ে শেষ পর্যন্ত ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি। পরবর্তীকালে কানাডার একটি আদালত পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির একটি মামলায় যুগান্তকারী রায় দেয়। যে কথিত অভিযোগের ভিত্তিতে এ প্রকল্পে ঋণ বাতিল করেছিল বিশ্বব্যাংক। পরবর্তীকালে এ অভিযোগের কোন ভিত্তি ছিল না বলে ২০১৭ সালে দেয়া এক রায়ে উল্লেখ করে দেশটির আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণে আলোচিত মামলাকে অনুমানভিত্তিক বলেও উল্লেখ করা হয়। কানাডার আদালতের এ রায়কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সততার শক্তির জয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের মর্যাদা বেড়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পেছনে বাংলাদেশের একজন নোবেল বিজয়ীর প্রভাব ছিল বলে আলোচনা শোনা যায়। বিষয়টি নিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে যেন অর্থায়ন না হয় সেই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আমাদের দেশের একজন নোবেলজয়ী জড়িত। ব্যাংকের পদে থাকতে না পেরে তিনি এই ষড়যন্ত্র করেছিলেন। আর সে সময় ওই নোবেল জয়ীর সঙ্গে যোগ হয়েছিলেন বাংলাদেশবিরোধী নানা অপশক্তি।

পদ্মায় ভাস্বর হোক শেখ হাসিনার নাম

বঙ্গবন্ধুর পথ ধরে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে সংযুক্ত করার উদ্যোগ নেন। ১৯৯৮ সালে পদ্মায় সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন তিনি। সেই উদ্যোগের পথ ধরে ২০০১ সালে জাপানীদের সহায়তায় সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়। ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া পয়েন্টে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিএনপি-জামায়াত জোট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পদ্মা সেতু প্রকল্পের গতি থমকে যায়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হলে প্রকল্পটি ফের গতি পায়। ২০০৯ সালের ১৯ জুন পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে। ২৯ জুন চুক্তি হয় পরামর্শকের সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুব আন্তরিকভাবে চেয়েছেন যেন বাংলাদেশের মানুষ পদ্মা সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত হতে পারে। আজ পদ্মায় যে সংযোগ স্থাপিত হয়েছে তা একান্তই বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদান। বহু বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বাংলাদেশের মানুষ যে সফলতার পথ দেখেছে তা সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার শক্তিশালী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্যই। কবিতার ভাষায়, ষড়যন্ত্রীরা হেরেছে, বিশ্ব জেনেছে/ এ গৌরব আমরাই ছিনিয়ে আনলাম/ পদ্মায় এবার ভাস্বর হোক শেখ হাসিনার নাম।