• মঙ্গলবার   ০৯ মার্চ ২০২১ ||

  • ফাল্গুন ২৫ ১৪২৭

  • || ২৫ রজব ১৪৪২

ফিরে আসা মসলিনের জিআই স্বত্ব

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০২১  

বাংলার ইতিহাসের গৌরবময় অনুষঙ্গগুলোর অন্যতম মসলিন। শুধু ভারতজুড়ে নয়, বাংলার মসলিনের কদর একসময় প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। হারিয়ে যাওয়া সেই মসলিন আবার ফিরে এসেছে। সম্প্রতি মসলিনের জিআই স্বত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ। লিখেছেন সাদিয়া সিদ্দিকা 

জিআই স্বত্ব

হারিয়ে যাওয়ার পরও আবারও ফিরে এসেছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মসলিন। ঢাকাই মসলিনের শেষ প্রদর্শনী হয়েছিল ১৮৫০ সালে, লন্ডনে। এর ঠিক ১৭০ বছর পর বাংলাদেশে আবার বুনন শুরু হয় মসলিনের। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের এই মসলিনের জিআই স্বত্বের (ভৌগোলিক নির্দেশক) অনুমোদনও মিলেছে। জিআই স্বত্ব উৎপাদকদের নিজস্বতার স্বীকৃতি দেয়। এতে অন্য দেশের সমজাতীয় পণ্য থেকে তাদের পণ্য আলাদাভাবে চেনা যায়। এই পণ্যের আলাদা গুরুত্ব তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে উৎপাদনকারীরা পণ্যের জন্য ভালো দাম পান। ট্রেডমার্কের সঙ্গে এর পার্থক্য হলোট্রেডমার্ক কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিতে পারেন কিন্তু ভৌগেলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ একটি দেশ প্যাটেন্ট করতে পারে। যা সেই দেশের পণ্য হিসেবে বিশ্ববাজারে পরিচিতি পাবে। এতে স্থানীয় উৎপাদকরা ভালো দাম পান। মোট কথা জিআই পণ্য কোনো দেশ আমদানি করতে চাইলে তাহলে উৎপাদনকারী দেশকে একটি নির্ধারিত হারে রয়্যালটি পরিশোধ করতে হয়। যা জিআই সনদ না পাওয়া পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় না। জিআই পণ্য প্রক্রিয়ায় একটি দেশ তার দেশের নির্দিষ্ট কিছু পণ্যকে নিবন্ধন করে। এর ফলে ওই পণ্যটি যেমন নিজস্ব ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পায়, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে সেই পণ্যের মূল্যও বাড়ে। জিআই পণ্য হিসেবে অনেক আগেই স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশের জামদানি। এবার এই তালিকায় যুক্ত হলো মসলিন।

২০১৪ সালের অক্টোবরে মসলিনের ঐতিহ্য পুনরায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় শুরুতে বাংলাদেশে যে যে অঞ্চলে মসলিন তৈরি হতো তার একটি প্রতিবেদন বানানো হয়। এর আগে ২০১৩ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মসলিন কাপড় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয় দৃক। এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং মসলিন প্রকল্পের উদ্যোক্তা সাইফুল ইসলাম তিন বছর ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে মসলিন কাপড় নিয়ে গবেষণা ও অধ্যয়ন করেন। অনুসন্ধান করেন আসল মসলিন কাপড়ের। এক পর্যায়ে ভারতের জয়পুরে খুঁজে পান মসলিন কাপড় তৈরির তুলা গাছ ‘ফুটি কার্পাস’। সেখান থেকে বীজ নিয়ে এসে গাজীপুরের শ্রীপুরের তুলা উন্নয়ন বোর্ড গবেষণা কেন্দ্রে নতুন করে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এ গাছের চাষ শুরু করে দৃক। বিলুপ্ত আসল ফুটি কার্পাসের সঙ্গে এ গাছের কোনো তারতম্য আছে কি-না তা জানতেও চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ২০১৯ সালে এখানে প্রায় ৩০০ গাছের আবাদ হয়। পরের বছর প্রায় ১৫০টি গাছের চাষাবাদ হয়। আসল ফুটি কার্পাস গাছ বছরে দু’বার চাষ হতো। এ গাছে বছরে একবার চাষ হচ্ছে। সাধারণত জুলাই মাসে ফুটি কার্পাস হয় এবং ডিসেম্বরে গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা হয়। দৃক এসব গাছ থেকে তুলা সংগ্রহ করে ভারত থেকে সুতা বানিয়ে নিয়ে আসছে। সেই সুতা দিয়ে দেশীয় তাঁতে মসলিন কাপড় তৈরি করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিকল্পনা অনুযায়ী বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের একটি কমিটি গঠন করা হলে সেখানে তারা গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকেন। এর মধ্যে ছিলেন গোলাম মোস্তফা, মঞ্জুরুল ইসলাম, বুলবুল ইসলাম, ফিরোজ আলম, আব্দুল আলিমসহ আরও অনেকে। তারা মসলিন নিয়ে একটি প্রকল্পের কাজে হাত দেন। এই প্রকল্পের প্রধান ছিলেন মঞ্জুর হোসেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অধাপক।

কাজের শুরুতে তাদের কাছে মসলিন কাপড়ের বা তুলার কোনো নমুনা ছিল না। তাই তারা পরিকল্পনা করেন, যে সুতা দিয়ে মসলিন বোনা হতো সেই গাছ খুঁজে বের করার। সেই গাছ আসলেই কার্পাস কি না তা যাচাই করা হয়েছিল সবার আগে। সে কাজের জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল মসলিন কাপড়ের। অর্থাৎ একদম প্রথম থেকে মসলিন কাপড় আর কার্পাস তুলা খুঁজে বের করাই ছিল তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। মঞ্জুর হোসেন জানান, মসলিন কাপড়ের নমুনা পেলেই তারা সেটি কার্পাস গাছের ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন। এক সময় সেই গাছ খোঁজার জন্য খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হয়। এরপর ২০১৭ সালের মার্চ মাস নাগাদ রাঙ্গামাটি থেকে এই গাছের সন্ধান মেলে এবং বিভিন্ন গবেষণার পর এরা মসলিনের কার্পাসের সঙ্গে মিল খুঁজে পান। সব জল্পনা-কল্পনা শেষে প্রায় ১৭০ বছর পর বাংলায় আবার মসলিন সৃষ্টি হয়, সৃষ্টি হয় অনন্য ও নতুন এক ইতিহাস।

নানা ধরনের মসলিন

মসলিন সাধারণত এক প্রকার বিশেষ তুলার আঁশ থেকে প্রস্তুতকৃত এক প্রকার অতি সূক্ষ্ম কাপড়। ঢাকাই মসলিন নামেও এটি পরিচিত। ফুটি কার্পাস নামক তুলা থেকে খুব চিকন সুতা দিয়ে মসলিন তৈরি করা হতো। চরকা দিয়ে কাটা কিংবা হাতে বোনা মসলিনের জন্য সর্বনিম্ন তিনশো কাউন্টের সুতা ব্যবহার করা হতো যার ফলে মসলিন একদম স্বচ্ছ কাচের মতো দেখাত। ঢাকার কাছের সোনারগাঁ অঞ্চলে এই মসলিন তৈরি করা হতো। রাজকীয় পোশাক তৈরিতেই এর ব্যবহার বেশি ছিল।  মূল্যবান এই কাপড়ের ধরন আছে প্রায় ২৮ রকমের। তবে এর মধ্যে জামদানি এখনো বেশ প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু নানা কারণে আনুমানিক আঠারো শতকের শেষে বাংলায় এই মসলিনের বুনন বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত মসলিনের পার্থক্য করা হতো এর সূক্ষ্মতা, বুনন শৈলী ও নকশার ভিত্তিতে। একেক কারণে এর প্রকারভেদও আলাদা আলাদা নামের হয়। মসলিনের প্রকারভেদগুলোর মধ্যে আছে- 

মলবুস খাস : মলবুস খাসের অর্থ হচ্ছে খাস বস্ত্র। সব ধরনের মসলিনের মধ্যে এই মসলিন সবচেয়ে বেশি দামি ছিল যা ব্যবহার করতেন প্রাচীন সম্রাটরা। পরে আঠারো শতকের শেষে একই রকম বৈশিষ্ট্য নিয়ে মলমল খাস নামে আরও একটি মসলিন আবিষ্কার করা হয়। এই কাপড়টিই একটি আংটির ভেতর দিয়ে পুরোটা ঢুকানো যেত অনায়াসেই। এই মসলিনই অন্য দেশে রপ্তানি করা হতো।

সরকার-ই-আলা : মলবুসের মতো এই মসলিনও বেশ উঁচুমানের ছিল। এই মসলিন তৈরি হতো সাধারণত বাংলার তৎকালীন নবাব বা সুবেদারদের জন্য। সরকার-ই-আলা নামের এক স্থান থেকে পাওয়া খাজনা দিয়ে এর দাম শোধ করা হতো বলে এর এমন নামকরণ।

ঝুনা : ঝুনা শব্দটি উঠে এসেছে হিন্দি শব্দ ‘ঝিনা’ থেকে যার অর্থ সূক্ষ্ম। এই মসলিনও বেশ সূক্ষ্ম সুতা দিয়েই তৈরি করা হতো। তবে অন্যান্য মসলিনের তুলনায় এর সুতার পরিমাণ বেশ কম থাকত যার কারণে এই মসলিন দেখতে বেশ পাতলা দেখাত। এই মসলিন কখনোই বাইরে রপ্তানি করা হয়নি। এই মসলিন পাঠানো হতো রাজদরবারে। রাজদরবারের মহিলারা এই মসলিনের কাপড় গরমকালে ব্যবহার করতেন।

আব-ই-রওয়ান : আব-ই-রওয়ান শব্দটি একটি ফার্সি শব্দ যার অর্থ প্রবাহিত পানি। মসলিনের এমন নামকরণের কারণ হচ্ছে এই মসলিন বেশ সূক্ষ্ম এবং এর সূক্ষ্মতা বোঝাতে পানির মতো টলমলে উপমা থেকে এর নাম হয়ে যায় আব-ই-রওয়ান। এই মসলিনের প্রচলিত বেশ কিছু গল্প রচিত হয় যা খুবই চমৎকার ছিল। জানা যায়, একবার সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে তার মেয়ে উপস্থিত হলে তিনি বেশ রাগ করেই তার মেয়েকে বলেন তার কি কোনো কাপড়ের অভাব রয়েছে? তখন তার মেয়ে বেশ আশ্চর্য হয়ে বলেন তিনি আব-ই-রওয়ান মসলিনের সাতটি জামা পরে আছেন। প্রচলিত এই গল্প থেকেই আন্দাজ করা যায়, আব-ই-রওয়ান মসলিন কতটা সূক্ষ্ম এবং পাতলা ছিল। 

খাসসা : এই শব্দটিও ফার্সি শব্দ। এই মসলিন মিহি ও সূক্ষ্ম তবে এর বুনন বেশ ঘন ছিল। আনুমানিক ১৭ শতকের দিকে সোনারগাঁ বিখ্যাত হয় এই খাসসা কাপড়ের জন্য। এরপর ১৮-১৯ শতকের দিকে জঙ্গলবাড়ি বিখ্যাত হয় এই খাসসার জন্য। ইংরেজরা একে ডাকত কুষা বলে।

শবনম : শবনম শব্দের অর্থ ভোরের শিশির। এক প্রকার মসলিন তৈরি হতো যা শিশিরভেজা ঘাসে শুকাতে দেওয়া হলে আর দেখাই যেত না। এই মসলিনই শবনম মসলিন। মসলিনের এই রকমটি ছিল খুবই মিহি আর সূক্ষ্ম।

নয়ন সুখ : এই মসলিন ব্যবহার করা হতো গলার রুমাল হিসেবে। সব মসলিনের মধ্যে কেবল এটিই বাংলা নামে নামকরণ করা হয়।

বদন খাস : বদন খাস মসলিন ব্যবহার হতো শুধু গায়ের জামার জন্য। তাই এর নামও বদন খাস। অন্যান্য মসলিনের মতো এই মসলিনের বুনন ততটা ঘন ছিল না।

জামদানি : জামদানি সাধারণত কার্পাস তুলা দিয়ে তৈরি করা হতো। মসলিনের উত্তরাধিকারী এই কাপড় তৎকালীন বাঙালি নারীদের বেশ পছন্দের ছিল। এই জামদানি সরাসরি তৈরি হতো না। মসলিনের ওপর নকশা করে একে তৈরি করা হতো। বর্তমান যুগে জামদানি বলতে আমরা কেবল শাড়ি বুঝলেও আগের যুগে এই জামদানির ইতিহাসের পেছনে বেশ কিছু ঘটনা জড়িয়ে আছে। ১৭ শতাব্দীতে এই জামদানি দিয়ে নকশাওয়ালা শেরওয়ানি বানানো হতো। এখনকার জামদানিতে বেশ পরিবর্তন এলেও আগের যুগের জামদানি ছিল শুধুমাত্র নকশা করা মসলিন।

পুরনো দিনের তাঁতিরা

দেখতে সুন্দর হলেও অতি সূক্ষ্ম মসলিন তৈরি করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। মসলিন তৈরিতে তাঁতিদের দিনে প্রায় আট দশ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। কাজ সহজ করার জন্য মসলিন তৈরিতে তাঁতিরা তিনজন মিলে একটি দল গঠন করে নিত। এই তিনজনের মধ্যে একজন ওস্তাদ, একজন সহকারী এবং আরেকজন কারিগর হিসেবে কাজ করত। বড়রা ছাড়াও ১০/১২ বয়সী শিশুরাও মসলিন তৈরিতে নিকারি হিসেবে কাজ করত। অর্থাৎ সরাসরি মজুরি ছাড়া শুধু খাবার ও থাকার জায়গাই পেত শিশুরা। তিন-চার বছর কাজ করার পর তাদের মজুরি দেওয়া শুরু হতো। ওস্তাদ তাঁতিরা দিনে এক দিনার করে মজুরি পেতেন। সহকারী তাঁতিরা তাদের থেকে ৪০/৫০% কম মজুরি পেতেন। প্রচণ্ড পরিশ্রমের পরেও তারা ন্যায্যমূল্য পেতেন না। ভারতবর্ষে ইংরেজদের আধিপত্যের পর থেকেই অন্যান্য ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে শুরু করে। তারা তাঁতিদের সুতা কিনতে উচ্চসুদে অর্থ প্রদান করতেন। তাঁতিরা সময়মতো তাদের সুদ প্রদান না করতে পারায় সুদের পরিমাণ এক সময় আকাশছোঁয়া হয়ে যায়।

সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে

১৭ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ ও ডাচ ব্যবসায়ী লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে ভারতে যাত্রা শুরু করেন। এই সময় এরা বাংলার মসলিনসহ অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী সিরিয়ায় বিক্রি করতে শুরু করেন। ইস্তাম্বুলের এক বাজারে সরকারি গুদামে আনুমানিক ১৬৪০ সালের পুরনো প্রায় বিশ ধরনের মসলিন পাওয়া গেছে। আসলে এর বেশ উচ্চমূল্য পাওয়ার কারণেই ধীরে ধীরে এর বাণিজ্য শুরু হতে থাকে।

এই শতকের শুরুতে অস্টেন্ড কোম্পানি বাংলায় ব্যবসা করতে আসে। তারা তাদের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বস্ত্র কিনতে শুরু করে। ব্যবসায় লাভ শুরু হলে ঢাকায় বাস করা শুরু করেন কর্মকর্তারা। ১৭৪৭ সালে ঢাকার বস্ত্রশিল্প পণ্যে মসলিনের বাণিজ্যের মূল্য ছিল প্রায় সাড়ে ২৮ লাখ টাকা।

কেন হারিয়ে গিয়েছিল

ম্যানচেস্টারে শিল্প বিপ্লবের পর ইংরেজদের ব্যবসায় বেশ কিছু পরিবর্তন আসে। ইউরোপিয়ানরা ভারত থেকে পণ্য আমদানি করা শুরু করলে বাজারে সরবরাহ করত ইংরেজরা। মোগল শাসনামলে রমরমা অবস্থা বেশ কমে আসে, যার কারণে তৎকালীন মসলিন তাঁতিদের দুর্দশা শুরু হতে থাকে। এক সময় বিভিন্ন কারণে তাঁতিদের মসলিন নিয়ে কাজ করার সুযোগ কমে আসতে থাকে এবং এক পর্যায়ে বাংলায় ও ঢাকার আশপাশে মসলিনের তাঁত বন্ধ হয়ে যায়। এর পেছনে মূল ঘটনা ছিল কারিগরদের পালিয়ে যাওয়া, মসলিনের প্রধান উপকরণ কার্পাসের চাহিদা কমে আসা এবং কার্পাসের জমিতে বিকল্প চাষবাসের শুরু। জানা যায়, ব্রিটিশ শাসকরা মসলিন তাঁত বন্ধ করে দেওয়ার জন্য মসলিন বুননকারীদের হাতের বুড়ো আঙুল কেটে দিতেন। অন্য এক তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশরা নয়, বরং মসলিন তাঁতিরাই নিজেদের আঙুল কেটে ফেলতেন যেন তাদের আর তাঁতের কাজ করতে না হয়। আর এসব কারণেই ধীরে ধীরে মসলিনের বুনন একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় একসময়।

এছাড়া ১৭৪২-১৭৮৭ সালে ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব শুরু হলে স্থানীয়ভাবে তুলা উৎপাদন করা শুরু হতে থাকে। আর ব্রিটেন থেকে তুলা আমদানি করার কারণে মসলিন শিল্প এক সময় হারিয়ে যায়। শস্য রপ্তানির ওপর এক সময় ট্যাক্স প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। যার ফলে মানুষ মসলিন তাঁত ছেড়ে চাষের দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে উঠতে শুরু করে। তাছাড়া ভয়াবহ বন্যা, দুর্ভিক্ষের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে বাংলা। মসলিন তৈরির ওপর শুল্ক ধার্য করার পর থেকেই মূলত বাংলার বাণিজ্যে এর পতন ঘটতে থাকে।