• রোববার   ২৫ অক্টোবর ২০২০ ||

  • কার্তিক ১০ ১৪২৭

  • || ০৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

৯৭

বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণের উপায়

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর ২০২০  

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِنَّ الصَّدَقَةَ لَتُطْفِئُ عَنْ أَهْلِهَا حَرَّ الْقُبُوْرِ، وَإِنَّمَا يَسْتَظِلُّ الْمُؤْمِنُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فِيْ ظِلِّ صَدَقَتِهِ 

‘নিশ্চয়ই দান কবরের শাস্তিকে মিটিয়ে দেয় এবং কেয়ামতের দিন মুমিন তার দানের ছায়াতলে ছায়া গ্রহণ করবে’। (সিলসিলা সহিহা হা/১৮১৬/৩৪৮৪)

তিনি আরো বলেন, 

صَدَقَةُ السِّرِّ تُطْفِيُ غَضَبَ الرَّبِّ 

‘গোপন দান প্রতিপালকের ক্রোধকে মিটিয়ে দেয়’। (সিলসিলা সহিহািহ হা/১৮৪০)

হাফেয ইবনুল ক্বায়্যিম (রহ.) বলেন,

فإن للصدقة تأثيراً عجيباً في دفع أنواع البلاء ولو كانت من فاجر أو من ظالم بل من كافر، فإن الله تعالى يدفع بها عنه أنواعاً من البلاء، وهذا أمر معلوم عند الناس خاصتهم وعامتهم وأهل الأرض كلهم مقرون به لأنهم جربوه 

‘দান-সাদাকার অত্যাশ্চর্য প্রভাব রয়েছে বিভিন্ন প্রকার বালা-মুসিবত প্রতিরোধে। যদিও সে (দানকারী) পাপী, অত্যাচারী, এমনকি ছোট-খাট কুফরীকারী হয়। আল্লাহ তায়ালা দানের দ্বারা দানকারী থেকে নানা ধরনের বালা-মুসিবত প্রতিহত করেন, যা নির্দিষ্ট ও অনির্দিষ্ট সব মানুষের জানা বিষয়। দুনিয়াবাসী এর দ্বারা স্থায়ীত্ব লাভ করে। কেননা তারা তা দ্বারা পরীক্ষিত’। (আল-ওয়াবিলুছ ছায়ব মিনাল কামিতি তাইয়েব, ১/৩১ পৃঃ)

হাফেজ ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহ.) বলেন,

أَنَّ الصَّدَقَةَ تَدْفَعُ الْعَذَابَ وَأَنَّهَا قَدْ تُكَفِّرُ الذُّنُوْبَ، 

‘নিশ্চয়ই সাদাকা আজাব প্রতিরোধ করে এবং তা গুনাহ মিটিয়ে দেয়’। (ফৎহুল বারী, ১/৪০৬)

২. বেশি বেশি নেক আমল বা সৎকাজ করা: আমলে সালেহের মাধ্যমে আপতিত বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। রাসূল (সা.) বলেছেন,

صَنَائِعُ المَعْرُوْفِ تَقِي مَصَارِعَ السُّوْءِ وَالآفَاتِ وَالْهَلَكَاتِ، وَأَهْلُ المَعْرُوْفِ فِي الدُّنْيَا هُمْ أَهْلُ الْمَعْرُوْفِ فِي الآخِرَةِ 

‘সৎকর্ম করা বালা-মুসিবত, বিপদাপদ ও ধ্বংস থেকে রক্ষার মাধ্যম। আর দুনিয়াতে যিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্গত, আখেরাতে তিনি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হবে’।  (ত্বাবারানী, আল-আওসাত; সহিহুল জামে‘ হা/৩৭৯৫; সহিহ আত-তারগীব হা/৮৯০)

হাফেয ইবনুল ক্বায়্যিম (রহ.) বলেন,

وَمِنْ أَعْظَمِ عِلَاجَاتِ الْمَرَضِ فِعْلُ الْخَيْرِ وَالْإِحْسَانِ وَالذّكْرُ وَالدّعَاءُ وَالتّضَرّعُ وَالِابْتِهَالُ إلَى اللهِ وَالتّوْبَةُ وَلِهَذِهِ الْأُمُورِ تَأْثِيْرٌ فِيْ دَفْعِ الْعِلَلِ وَحُصُوْلِ الشّفَاءِ 

‘আর রোগ থেকে আরোগ্যের বড় প্রতিষেধক হলো সৎকাজ করা, দান-সাদাকা করা, জিকির-আজকার ও দোয়া করা, কাকুতি-মিনতি করা এবং বিনীত হয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করা। রোগ প্রতিরোধে এবং আরোগ্য লাভে এসব কাজের প্রভাব রয়েছে’। (ইবনু কায়্যেম, যাদুল মা‘আদ, ৪/১২৪)

৩. আল্লাহর নিকটে বিনীতভাবে দোয়া করা: আজাব-গজব ও বিপদাপদ থেকে রক্ষার অন্যতম উপায় হচ্ছে আল্লাহর নিকটে বিনীতভাবে দোয়া করা। কাকুতি-মিনতি সহকারে তাঁর নিকটে পাপ থেকে ক্ষমা চাওয়া এবং তাঁর সন্তোষ কামনা করা। তাহলে আল্লাহ দোয়া কবুল করবেন এবং পাপীদেরকে ধ্বংস করবেন না। আল্লাহ বলেন,

وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا إِلَى أُمَمٍ مِنْ قَبْلِكَ فَأَخَذْنَاهُمْ بِالْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ لَعَلَّهُمْ يَتَضَرَّعُوْنَ، فَلَوْلا إِذْ جَاءَهُمْ بَأْسُنَا تَضَرَّعُوْا وَلَكِنْ قَسَتْ قُلُوْبُهُمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ،

‘আমরা তোমার পূর্বেকার সম্প্রদায় সমূহের নিকট রাসূল পাঠিয়েছিলাম। অতঃপর (তাদের অবিশ্বাসের কারণে) আমরা তাদেরকে অভাব-অনটন ও রোগ-ব্যাধি দ্বারা পাকড়াও করেছিলাম। যাতে কাকুতি-মিনতিসহ আল্লাহর প্রতি বিনীত হয়। যখন তাদের কাছে আমাদের শাস্তি এসে গেল, তখন কেন তারা বিনীত হলো না? বরং তাদের অন্তরসমূহ শক্ত হয়ে গেল এবং শয়তান তাদের কাজগুলোকে তাদের নিকটে সুশোভিত করে দেখালো’। (সূরা: আন‘আম ৬/৪২-৪৩)

তিনি আরো বলেন,

وَمَا أَرْسَلْنَا فِيْ قَرْيَةٍ مِنْ نَبِيٍّ إِلَّا أَخَذْنَا أَهْلَهَا بِالْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ لَعَلَّهُمْ يَضَّرَّعُوْنَ 

‘কোনো জনপদে যখন আমরা কোনো নবী পাঠাই, তখন সেখানকার অধিবাসীদেরকে (পরীক্ষা করার জন্য) নানাবিধ কষ্ট ও বিপদে আক্রান্ত করি। যাতে তারা অনুগত হয়’। (সূরা: আ‘রাফ ৭/৯৪)

রাসূল (সা) বলেন,

إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللهِ، وَإِنَّهُمَا لاَ يَخْسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ، وَإِذَا كَانَ ذَاكَ فَصَلُّوْا وَادْعُوْا حَتَّى يُكْشَفَ مَا بِكُمْ 

‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শন সমূহের মধ্যে দু’টি নিদর্শন। কারো মৃত্যুর কারণে এ দু’টোর গ্রহণ হয় না। কাজেই যখন গ্রহণ হবে, তা মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সালাত আদায় করবে এবং দোয়া করতে থাকবে। এ কথা নবী করিম (সা) এ কারণেই বলেছেন যে, সেদিন তাঁর পুত্র ইব্রাহিম (রা.) এর মৃত্যু হয়েছিল এবং লোকেরা সে ব্যাপারে পরস্পর বলাবলি করছিল’। (বুখারি হা/১০৬৩, ১০৪০; মিশকাত হা/১৪৮৩)

বালা-মুসিবত থেকে পরিত্রাণের জন্য নিম্নোক্ত দোয়াগুলো পড়া যায়।

ক. দোয়া ইউনুস পড়া : রাসূল (সা.) বলেন,

ألاَ أُخْبِرُكمْ بِشَيْءٍ إذَا نَزَلَ بِرَجُلٍ مِنْكمْ كَرْبٌ أوْ بَلاءٌ مِنْ أمْرِ الدُّنْيا دَعَا بِهِ فَفُرِّجَ عَنْهُ دُعَاءُ ذِيْ النُّوْنِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أنْتَ سُبْحَانَكَ إنِّّيْ كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِيْنَ 

‘আমি তোমাদেরকে এমন কোনো বিষয়ের সংবাদ দিব যে, তোমাদের কারো উপরে যখন দুনিয়াবী কোন কষ্ট-ক্লেশ অথবা বালা-মুছীবত নাজিল হয়, তখন তার মাধ্যমে দোয়া করলে তা দূরীভূত হয়। তাহল মাছ ওয়ালা ইউনুস (আ.) এর দোয়া- ‘লা ইলা-হা ইল্লা আনতা সুবহা-নাক ইন্নী কুনতু মিনায যলেমীন’।  (সহিহুল জামে‘ হা/২৬০৫; সহিহাহ হা/১৭৪৪)

খ. اللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُونِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئِ الأَسْقَامِ ‘আল্লা-হুম্মা ইন্নি আ‘ঊযুবিকা মিনাল বারাছি ওয়াল জুনূনি ওয়াল জুযা-মি ওয়া মিন সাইয়িইল আসক্বা-ম’। 

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই শ্বেতরোগ, মস্তিষ্ক বিকৃতি, কুষ্ঠ এবং সব ধরনের দুরারোগ্য ব্যাধি হতে’। (আবূদাঊদ হা/১৫৫৪; মিশকাত হা/২৪৭০)

গ. أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ 

‘আ‘ঊযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত তাম্মা-তি মিন শার্রি মা খালাক্ব’।
 
অর্থ: ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমা সমূহের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টির যাবতীয় অনিষ্টকারিতা হতে পানাহ চাচ্ছি’। (মুসলিম হা/২৭০৮; মিশকাত হা/২৪২২)

৪. আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করা : আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করলে আল্লাহ খুশি হন এবং ক্রন্দনকারীকে রক্ষা করেন। যারা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে তাদের প্রশংসায় আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَيَخِرُّوْنَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُوْنَ وَيَزِيْدُهُمْ خُشُوْعًا 

‘আর তারা কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয়চিত্ততা আরো বৃদ্ধি পায়’। (সূরা: ইসরা ১৭/১০৯)

রাসূল (সা.) বলেছেন,

لاَ يَلِجُ النَّارَ رَجُلٌ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِى الضَّرْعِ وَلاَ يَجْتَمِعُ غُبَارٌ فِىْ سَبِيلِ اللهِ وَدُخَانُ جَهَنَّمَ 

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে কাঁদে সে জাহান্নামে যাবে না। দুধ যেমন গাভীর ওলানে ফিরে যাওয়া অসম্ভব। আল্লাহর পথের ধূলা এবং জাহান্নামের আগুন এক সঙ্গে জমা হবে না’।  (তিরমিযী হা/১৬৩৩, ২৩১১; নাসাঈ হা/৩১০৮; মিশকাত হা/৩৮২৮; সহিহুল জামে‘ হা/৭৭৭৮)

তিনি আরো বলেন,

عَيْنَانِ لاَ تَمَسُّهُمَا النَّارُ عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللهِ وَعَيْنٌ بَاتَتْ تَحْرُسُ فِى سَبِيلِ اللهِ 

‘দুই প্রকার চক্ষুকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। যে চক্ষু আল্লাহর ভয়ে কাঁদে এবং যে চক্ষু আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দেয়’। (তিরমিযী হা/১৬৩৯; মিশকাত হা/৩৮২৯; সহিহুল জামে‘ হা/৪১১৩)

অন্যত্র রাসূল (সা.) বলেন,

مَنْ خَافَ أَدْلَجَ وَمَنْ أَدْلَجَ بَلَغَ الْمَنْزِلَ أَلاَ إِنَّ سِلْعَةَ اللهِ غَالِيَةٌ أَلاَ إِنَّ سِلْعَةَ اللهِ الْجَنَّةُ 

‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে সে রাতে ইবাদত করে আর যে রাতে ইবাদত করে সে তার গন্তব্য স্থানে পৌঁছে যায়। মনে রেখ নিশ্চয়ই আল্লাহর সম্পদ দামী। মনে রেখ নিশ্চয়ই আল্লাহর সম্পদ হচ্ছে জান্নাত’। (তিরমিযী, আত-তারগীব হা/৪৭৮৭)

৫. আক্রান্ত এলাকায় গমন না করা : যে এলাকায় মহামারি দেখা দেয়, সেখানে গমন করতে রাসূল (সা) নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, 

فَإِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ بِأَرْضٍ فَلاَ تَقْدَمُوا عَلَيْهِ، وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلاَ تَخْرُجُوا فِرَارًا مِنْهُ 

‘তোমরা যখন কোনো স্থানে প্লেগের ছড়াছড়ি শুনতে পাও, তখন তোমরা সেখানে যেয়ো না। আর যখন প্লেগ এমন জায়গায় দেখা দেয়, যেখানে তুমি অবস্থান করছ, তখন সে স্থান হতে পালানোর লক্ষ্যে বের হয়ো না’।  (বুখারি হা/৩৪৭৩; মুসলিম হা/২২১৮)

পরিশেষে বলব, উপরোক্ত নির্দেশনাসমূহ পালনের মাধ্যমে আমরা বালা-মুসিবত নাজিল হওয়ার পূর্বে তা থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার চেষ্টা করি। আর বালা-মুসিবত আপতিত হয়ে গেলে সৎকর্ম, তত্তবা-এস্তেগফার ও দোয়ার মাধ্যমে তা থেকে বাঁচার চেষ্টা করি। 
আল্লাহ আমাদের সবাইকে বালা-মুসিবত থেকে বিশেষ করে চলমান করোনা মহামারি থেকে রক্ষা করুন। আমিন!

সংগ্রহে: প্রিয়ম হাসান

ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর