• শুক্রবার   ০৭ মে ২০২১ ||

  • বৈশাখ ২৪ ১৪২৮

  • || ২৬ রমজান ১৪৪২

লকডাউন উপেক্ষা করে হাট-বাজার

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ৩ মে ২০২১  

করোনা পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত চলমান লকডাউন উপেক্ষা করেই গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত টঙ্গী বাজারে সাপ্তাহিক হাট বসানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও সাপ্তাহিক হাট-বাজারকে কেন্দ্র করে খাস আদায়ের নামে বিভিন্ন অনিয়ম ও চাঁদাবাজি বন্ধে শনিবার রাতে টঙ্গী বাজারে অভিযান পরিচালনা করেছে পুলিশ। এসময় স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে রাত ১০টার পর দোকান খোলা না রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের কয়েক দফা অনুরোধ করা হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। কিন্তু হাটে আগত ব্যবসায়ীরা পুলিশের নির্দেশনা উপেক্ষা করে দোকান বসানোর কারণে রাত ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত দফায় দফায় ব্যবসায়ীদের উপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এতে অন্তত ২০-৩০ জন ব্যবসায়ী ও পথচারী আহত হন। এসময় পুলিশের সঙ্গে মোটরসাইকেল নিয়ে দুই যুবককে পাইকারি ব্যবসায়ীদের মারধর করতে দেখা যায়।

তবে টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাবেদ মাসুদ পুলিশের লাঠিচার্জের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, হাটে আগত ব্যবসায়ীদের লাঠিচার্জ করার কোন নির্দেশনা ছিল না। যদি কোন পুলিশ কর্মকর্তার লাঠিচার্জ করার প্রমাণ মেলে, তবে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা যায়, প্রতিবছর ১ বৈশাখ হতে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত এক বছরের জন্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত টঙ্গী বাজারে খাজনা আদায় করা হয়। কিন্তু গত দুই বছর যাবত সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোন ইজারাদারকে টঙ্গী বাজার ইজারা দেওয়া হয়নি। ফলে স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী, ইজারাবিহীন বাজার থেকে সিটি করপোরেশনের কমিটি খাস আদায় করবে। কিন্তু গত দুই বছর যাবত দুইশ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী এই টঙ্গী বাজারে খাস আদায়ের নামে খাজনা আদায় করছেন সরকার দলীয় কয়েকজন নেতাকর্মী। ফলে বাজারে দেখা দিয়েছে ব্যাপক অনিয়ম।

হাটে আগত বেশ কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতি সপ্তাহের রবিবার টঙ্গী বাজারে হাট বসে। দেশের বিভিন্ন জেলা শহর ও ঢাকার পাইকাররা তাদের পণ্য নিয়ে হাটে বেচাকেনার জন্য শনিবার রাতেই এসে উপস্থিত হন। সকাল থেকে কেনাকাটা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও টঙ্গী বাজারের হাটে রাত থেকেই ক্রেতাসমাগম শুরু হয়। ৪-৫ ফিট জায়গার একটি বিট থেকে খাজনা/খাস আদায়ের নামে ৫০০টাকা করে দিতে হয় প্রত্যেক ব্যবসায়ীকে। বাজারের যেসব মার্কেট, দোকান ও বাড়ির সামনে বিট বা দোকান বসানো হয় তারাও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে চাঁদা নিচ্ছেন। এছাড়াও সিটি করপোরেশনের বৈদ্যুতিক খুঁটির লাইটের জন্য ২০ টাকা, নাইটগার্ড বিল ১০ টাকা, ঝাড়ুদার বিল ১০ টাকা, হিজরা ২০ টাকাসহ নানা অজুহাতে হাটে আগত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। ক্রেতাসমাগম বেশি হয় এমন মার্কেট বা দোকানের সামনে বিট বরাদ্দের জন্য পাইকাররা এককালীন ২০-৫০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে রাখেন ওইসব মার্কেট ও দোকান মালিককে।

সরেজমিনে টঙ্গী বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, লকডাউন উপেক্ষা করে গাদাগাদি করে হাটে পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন পাইকাররা। এতে উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি। দোকানি এবং ক্রেতা অধিকাংশেরই মুখে মাস্ক নেই। রাত ১০টার কিছু সময় পর বাজারে পুলিশের টহল টিম এসে দোকান বন্ধের নির্দেশ দেয়। পুলিশের উপস্থিতিতে পাইকার দোকান বন্ধ করে দিলেও পুলিশ চলে গেলে ফের দোকান খুলে বেচাকেনা শুরু করা হয়। পরে রাত ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের দোকান বন্ধের জন্য কয়েক দফা লাঠিচার্জ করে পুলিশ।

নারায়ণগঞ্জ থেকে আগত পাইকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, লকডাউনের কারণে ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ। বউ-পোলাপাইন নিয়া অভাবে দিন কাটাইতেছি। আমাগোরে তো সরকার খাওন দিয়া যায় না। তাই বাধ্য হইয়া হাটে দোকান বসাইছি। কিন্তু এইহানেও শান্তি নাই। খাজনার টাকা দিলেও নামে বেনামে অনেকে আইসা টাকা নিয়া যায়। প্রতিবাদ করলেই গায়ে হাত তোলে।

পাবেল নামে আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ঈদ উপলক্ষে ঋণ নিয়ে মালামাল তৈরি করছি। এতো দূর থেকে গাড়ি ভাড়া দিয়ে হাটে আসছি, এখন পুলিশ বলতেছে এই হাট নাকি অবৈধ। তাই দোকান বসানো যাবে না। কিছুক্ষণ পরপর আইসা দোকান উঠাইয়া দিতেছে, মালামাল রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে। আমরা তো ব্যবসা করতে আসছি, চুরি করতে আসি নাই।

স্থানীয় কাউন্সিলর গিয়াস উদ্দিন সরকার বলেন, যেহেতু এবছর টঙ্গী বাজার ইজারা হয়নি তাই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে খাস আদায় করা হয়। আমি স্থানীয় কাউন্সিলর হিসেবে খাস আদায়ের ব্যাপারে আমাকে মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়েছে, এখনো চিঠি পাইনি। যদি খাস আদায়ের নামে কোন অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন অবশ্যই ব্যবস্থা নিবে।

টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাবেদ মাসুদ বলেন, লকডাউন উপেক্ষা করে নিয়মবহির্ভুতভাবে টঙ্গী বাজারে হাট-বাজার বসানো হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই বাজারে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য রয়েছে আমাদের কাছে। প্রত্যেক দোকানির কাছ থেকে খাজনা আদায়ের পরও নামে বেনামে চাঁদা আদায় করছে- একটি প্রভাবশালী মহল। তাই আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি।