• রোববার   ২৪ জানুয়ারি ২০২১ ||

  • মাঘ ১১ ১৪২৭

  • || ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

৮৩

স্বপ্নের পদ্মা সেতু,বিপুল সম্ভাবনার অর্থনীতি একটি প্রস্তাবনা

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ১ ডিসেম্বর ২০২০  

পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। একটির পর একটি স্প্যানে দৃশ্যমান এখন সেতুটির প্রায় পুরোটাই। যে পদ্মার একদিন ছিলো না কূল-কিনারা, আজ হেঁটেই পার হওয়া যায় প্রমত্তা সেই নদী- কী শীত, কী বর্ষায়। সামনের বছর শেষে পদ্মার বুকের উপর দিয়ে ছুটবে গাড়ি, চলবে ট্রেন। পদ্মা সেতু শুধু একটি স্বপ্নের বাস্তবায়ন নয়, যেমন এটি নয় শুধু একটি জাতির সক্ষমতার প্রতীক। এটি তার চেয়েও ঢের বেশি কিছু।

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। মার্কিন মূলুকের নামজাদা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার বাংলাদেশের নামের আগে জুড়ে দিয়েছিলেন ‘তলাবিহীন ঝুড়ির তকমাটি’। পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের শাসন নামের শোষণে এদেশে উন্নয়নের যে ছিটে-ফোটা ছোঁয়াও লেগেছিলো, তাও পাকিস্তানিরা গুড়িয়ে দিয়েছিলো একাত্তরের নয়টি মাসে। স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধু আর বাঙালি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন আবর্জনার স্তূপ। সেখান থেকেই বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বে বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর আর স্বপ্ন যাত্রার যে সূচনা, পাকিস্তানের পা’চাটা পশুগুলোর সহ্য হয়নি তা। পঁচাত্তরে মার্কিন-চীনা-পাকিস্তানি চক্রান্তে স্বপরিবারে নিহত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর বাংলাদেশের ইতিহাস শুধু পেছনে ছোটার। জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ার শাসনে না ঘটেছে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আর সামাজিক অগ্রগতি না আর্দশিক মুক্তি। বঙ্গবন্ধু যে বছর মারা যান, সেই পঁচাত্তরে আমাদের মাথাপিছু গড় আয় ছিলো তিনশ ডলারের উপরে, অথচ সাতাত্তরে তা নেমে আসে দুইশ ডলারের ঘরে। বঙ্গবন্ধুর সময়ে এদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিলো সাত শতাংশের কোঠায়, যা বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার অর্জন করতে সক্ষম হয় যখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ আবার এদেশে ক্ষমতায় এসেছিলো। বঙ্গবন্ধুর সময় গোলাম আজমরা ছিলো- হয় দেশের কারাগারে, নয়তো দেশের বাইরে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে, অথচ বঙ্গবন্ধু পরবর্তী প্রতিটি সরকারে তাদের স্থান হয়েছে মন্ত্রিসভায়। ব্যত্যয় হয়েছে তখনই যখন আবারও ক্ষমতায় শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের যে প্রায় যুগব্যাপী নিরবচ্ছিন্ন শাসন, তাতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তি যে অত্যাসন্ন তা আজ স্পষ্টতই প্রতিভাত। আর এক বছরের মধ্যেই আমরা উন্নীত হতে যাচ্ছি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের ক্যাটাগরিতে। সামনে ঢাকার আকাশে ছুটবে মেট্রোরেল আর চট্টগ্রামে কর্নফুলির তলায় ছুটবে গাড়ি। সেদিনও দূরে নয় যখন উত্তরবঙ্গ আলোকিত হবে পারমাণবিক বিদ্যুতে আর মাহাকাশে ঘুরপাক খাবে একাধিক বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যার কাছে আমাদের প্রত্যাশার ব্যাপ্তিটা আরও বিস্তৃত। শুধু অর্থনৈতিক মুক্তি আর উন্নত জীবনের হাতছানি আমাদের ক্ষিধা মেটায় না। জাতির জনকের আদর্শের জাতীয় চার মূলনীতি ভিত্তিক একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজের স্বপ্নও আমাদের শয়নে-স্বপনে।

সাম্প্রতিক সময়ে মৌলবাদী শক্তির যে আস্ফালন তা আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। সেই কোন জমানায় ব্রিটিশ আমলের বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে এই সেদিনের বিএনপি আমল, মাঝে শুধু বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন আর শেখ হাসিনার পাঁচ বছরের দুটো স্বল্প মেয়াদী শাসনকাল- এছাড়া পুরোটা সময়ইতো এদেশে সরকারিভাবে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে লালন-পালন-তোষণ করা হয়েছে। আজ ১২ বছরের আওয়ামী শাসনে কোণঠাসাপ্রায় অশুভ সাম্প্রদায়িক শক্তি তাদের আসন্ন বিলুপ্তির ঘ্রাণ পাচ্ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেপরোয়া আগুন সন্ত্রাসেও তাদের কূল রক্ষা হয়নি। নিভু নিভু প্রদীপের হঠাৎ জ্বলে ওঠার সবগুলো আলামত ইদানীং তাদের আচরণে স্পষ্ট। সমাজটাকে আবারও একটা সাংঘর্ষিক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার মরিয়া প্রচেষ্টায় তারা বঙ্গবন্ধুকেও ছেড়ে কথা বলছে না।

প্রগতিশীলদের ক্ষেদ আছে জানি, তারপরও মৌলবাদ আর উগ্রতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স আশা জাগায়। আশা জাগে যখন বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ‘ইয়াং বাংলার’ অনুষ্ঠানে স্পষ্ট করে দেন, ‘বাংলাদেশ তার প্রতিষ্ঠাকালীন মূলনীতি ধর্ম নিরপেক্ষতা থেকে সরে যেতে পারে না’। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দেন, ‘আমরা যে ধর্মেরই হই না কেন, আমরা সবাই বাঙালি’। খুব ভালো করে জানি বাহাত্তরের সংবিধানভিত্তিক একটি স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের যেতে হবে এখনো অনেকটা পথ, কিন্তু এটাও ঠিক সেই পথের শেষটা এখন অনেকটাই দৃশ্যমান। দুকুল ছাপানো পদ্মার একুল-ওকুল জুড়ে দেওয়া পদ্মার সেতু তাই শুধু আমাদের সক্ষমতা আর উন্নততর জীবনমানেরই স্বাক্ষবহ নয়, বরং এটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ যে বাংলাদেশের প্রত্যাশায় তারও ইঙ্গিতবহ।

বঙ্গবন্ধু একটি স্বাধীন বাংলাদেশর স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং তার সেই স্বপ্নটিকে তিনি বাস্তবেও রূপ দিয়েছিলেন। তার অকাল প্রয়াণে বাংলাদেশের স্বাপ্নিক যাত্রাটি মুখ থুবড়ে পড়েছিলো। সেখান থেকে দেশটাকে আবার টেনে তুলছেন বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা। তার স্বপ্নের পদ্মা সেতু বাঙালির ‘স্বপ্নের বাংলাদেশের’ স্মারক হয়ে স্বাক্ষ্য দেবে যুগে যুগে। আইফেল টাওয়ার যেমন ফ্রান্সের প্রতীক কিংবা স্ট্যাচু অব লিবার্টি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, আমাদের রাষ্ট্রের প্রতীক একদিন হবে এই সেতুটি, আর যার স্বপ্নের ফসল এই সেতু, তার নামের সঙ্গে সেই মহিয়ষী নারীর নামটি জুড়ে দিয়েই হয়তো আমরা তার প্রতি আমাদের অপার কৃতজ্ঞতার স্বাক্ষর রাখতে পারি।

লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

জাতীয় বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর