• শুক্রবার   ০৭ মে ২০২১ ||

  • বৈশাখ ২৪ ১৪২৮

  • || ২৬ রমজান ১৪৪২

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার : প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ১৭ এপ্রিল ২০২১  

বাঙালি জাতির ইতিহাসে মুজিবনগর সরকারের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখা, মুক্তিযােদ্ধাদের জন্য প্রয়ােজনীয় অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনের মাধ্যমে এ সরকার বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন ও মুক্তিযুদ্ধকে একটি সমন্বিত ও সুসংহত রূপ দেয়। ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকারের দিক নির্দেশনা ও বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশিত পথে এগিয়ে চলে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাক হানাদার বাহিনীর ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সােহরাওয়ার্দী উদ্যানে) আত্মসমর্পনের মাধ্যমে বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয় এবং বিশ্ব মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ।

 

কিন্তু এ মুজিবনগর সরকার বা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন হঠাৎ করে হওয়া কোন ঘটনা নয়। স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ২৩ বছরের মুক্তি সংগ্রামের অবধারিত পরিণতিই ছিল ১৭ এপ্রিলের মুজিবনগর সরকারের শপথ। বাংলাদেশকে স্বাধীন করার কথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভাবতে শুরু করেন পাকিস্তান সৃষ্টিলগ্ন থেকেই। পাকিস্তান বাঙালির মায়ের ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে। তখনই সেদিনের তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন যে, পাকিস্তান সৃষ্টির মাধ্যমে কেবল ইংরেজ প্রভুর পরিবর্তে পাঞ্জাবি প্রভুব এসেছে এবং ইংরেজ শাসক-শােষকের পরিবর্তে পাঞ্জাবি শাসক-শােষকেরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। কিন্তু যে বাঙালিরা পাকিস্তান সৃষ্টি করেছে তারা পাকিস্তানের কলােনি রয়ে গেলে।

 

যেই চিন্তা সেই কাজে হাত দিয়ে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের জন্ম দেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলনের সময় রাজপথ থেকে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান এবং ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার সময় জেলখানা থেকেই কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্মসম্পাদক নির্বাচিত হন। জেলখানা থেকে বরে হয়ে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেই আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করেন। হক-ভাসানী-সােহরাওয়ার্দী ও তরুণ নেতা শেখ মুজিবের নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করে। মাত্র ৯টি আসন ব্যতীত সবকটি আসনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। কিন্তু কয়েকমাসের মধ্যেই পাকিস্তানি গােয়েন্দা বাহিনীর মদদে নারায়ণগঞ্জে আদমজি জুট মিলে বাঙালি বিহারী দাঙ্গা বাধিয়ে '৯২(ক)' ধারা জারি করে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেবকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে অপসারণ করে এবং বঙ্গবন্ধুকে মন্ত্রীর বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে জেলখানায় নিয়ে যায়। ১৯৫৬-৫৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বঙ্গবন্ধু তাঁর বক্তব্যে বারবার পাকিস্তানিদের হুঁশিয়ার করেন এবং দৃঢ়কণ্ঠে বাঙালির উপর নির্যাতন, শােষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেন। বাঙালির উপর শােষণ ও বৈষম্য বন্ধ না করলে বাঙালিরা আলাদাভাবে ভাবতে ও সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে বলেও পাকিস্তান সংসদে উল্লেখ করেন।

 

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন হওয়ার সিদ্ধান্ত হলে মুসলিম লীগের পরাজয় এবং আওয়ামী লীগের জয়লাভ করার সম্ভাবনা বুঝতে পেরে পাকিস্তানের কায়েমি স্বার্থবাদীরা জেনারেল আইয়ুব খানের নেতৃত্বে সামরিক শাসন জারি করে বাঙালিদের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করার ব্যবস্থা করে এবং বঙ্গবন্ধুসহ অনেক রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করে জেলে আটকে রাখে।

 

১৯৬২ সালে বঙ্গবন্ধু জেল হতে বের হয়ে নিষিদ্ধ ঘােষিত আওয়ামী লীগ পুণরায় পুনর্গঠন শুরু করেন। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে স্বাধীনতার নিউক্লিয়াস গঠন করে এবং ১৯৬৪ সাল থেকে সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈন্যদের এবং বাঙালি সরকারি চাকুরিজীবীদের ঐক্যবদ্ধ করে বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। একই লক্ষ্যে ১৯৬৬ সালে বাঙালির বাঁচার দাবী ৬ দফা দিয়ে বাঙালিকে প্রকারান্তরে স্বাধীনতায় উদ্বুদ্ধ করতে শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে গ্রেফতারের প্রায় ৩ বৎসর পর বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করার জন্য তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে ফাসিরকাষ্ঠে ঝুলাতে পাকিস্তানিরা চূড়ান্ত পরিকল্পনা করে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুকে ফাসিরকাষ্ঠ থেকে মুক্ত করে ১০ লক্ষাধিক জনগণের সামনে সােহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক তােফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করেন। পাকিস্তানের তথাকথিত লৌহমানব ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া খান লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার (এল.এফ.ও) জারি করে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে যাবার সম্মতি জানান ।

 

আমরা ছাত্রলীগের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এল.এফ.ও মেনে নির্বাচনে অংশগ্রহণে প্রবল আপত্তি উত্থাপন করলে বঙ্গবন্ধু আমাদের ডেকে বলেন যে, “এই নির্বাচন ক্ষমতায় যাবার নির্বাচন নয় । এই নির্বাচনকে ৬ দফা তথা স্বাধীনতার পক্ষে রেফারেন্ডাম হিসেবে গণ্য করে কাজ করে যা। জনসভায় সুস্পষ্টভাবে বলবে ৬ দফা মেনে নিলে ১ দফার (অর্থাৎ স্বাধীনতা) আন্দোলন হবে। নির্বাচনকে জনমত গঠনের সর্বোত্তম সুযােগ হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। বাঙালির নেতা কে হবেন তাও নির্বাচনের মাধ্যমে ঠিক করতে হবে। বাঙালিরা আমার পক্ষে রায় দিলে কিভাবে এল.এফ.ও লাথি মেরে শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, সিন্ধু নদ পার করে দেবার শক্তি আমার পায়ে আছে। স্বাধীনতাই আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য। যা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভােট চা, নৌকাকে জেতাতে হবে।”

 

এল.এফ.ও-এর মূল কথা ছিল নির্বাচনে প্রচারকালে আঞ্চলিকতা বা বৈষম্যের কথা বলা যাবে না এবং নির্বাচনের ১৮০ দিনের মধ্যে পাকিস্তানের সংবিধান রচনা করতে হবে। ব্যর্থ হলে আপনা আপনি সংসদ বাতিল হয়ে যাবে। অর্থাৎ পাক সেনাদের ধারণা ছিল কোন দলই নিরঙ্কুশ সংক্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারবে না। ১৮০ দিনে সংবিধান রচনা করতে পারবে না। তাহলে রাজনৈতিক নেতাদের উপর সমস্ত দোষ চাপিয়ে সামরিক শাসনকেই স্থায়ী করতে পারবে।

 

পাকিস্তানিদের সমস্ত ধারণা ও গােপনীয় রিপাের্ট ভুল প্রমাণিত করে বাঙালি জাতি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুকে বাংলার ১৬২ আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন উপহার দিয়ে বাঙালি জাতির একক নেতা এবং পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে নির্বাচিত করে। জনগণের এই ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় রায়ই হলাে মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘােষণা করার মূল ভিত্তি।

 

১৯৭০ সালে ডিসেম্বর মাসে বা ১৯৭১ এর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ মাসেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় তারা বঙ্গবন্ধুকে যে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না তা আর বুঝতে বাকি থাকেনি। তাই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে সারা জাতি গেরিলা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।

 

বাঙালি জাতির উপর হত্যাযজ্ঞ চালানাের ঘৃণ্য পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯ মার্চ, ১৯৭১ ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব আরবারের নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনী ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার জন্য জয়দেবপুর যায়। এই সংবাদ পাবার পর জয়দেবপুরের (গাজীপুরের) হাজার হাজার বীর জনতা আমার নেতৃত্বে যে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল তার উদ্যোগে ১টি স্টেনগান ও ৫টি অটোমেটিক রাইফেল ও দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব আরবারকে প্রতিহত করে। যার ফলে পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব আরবার ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করতে পারেনি।

 

পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠী বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা না দিয়ে ভিতরে ভিতরে বাঙালিদের আক্রমণ ও নিশ্চিহ্ন করার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। বাঙালিদের স্বাধিকারের দাবি মেনে নেয়ার পরিবর্তে ২৫ মার্চ কালরাতে অপারেশন সার্চ লাইট নামক এক সামরিক অভিযানের নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিজের দেশের বৃহত্তম জনগােষ্ঠীর এবং নির্বাচিত প্রতিনিধির বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘােষণা করে। পিলখানা, রাজারবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কমলাপুর রেল স্টেশন এবং বস্তির ঘুমন্ত নারী, শিশু বৃদ্ধ ও নাগরিকের উপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঝাপিয়ে পড়ে। নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির উপর চালায় বর্বরােচিত ও নারকীয় হত্যাকাণ্ড।

 

অন্য যে কোনাে দিন অপেক্ষা ২৫ মার্চের ভয়ঙ্কর রাত শুধু বাঙালি জাতির কাছেই নয়, বিশ্বের গণহত্যার ইতিহাসেও এক নিকৃষ্টতম উদাহরণ। ২৫ মার্চ কাল রাতে গনহত্যা সংঘটনই পাক-হানাদার বাহিনীর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না, তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিসত্তাকে নির্মূল করা। বাংলাদেশে পরিচালিত এই নৃশংস ও বর্বরােচিত গণহত্যার স্বরূপ অন্যান্য গণহত্যার চেয়ে অধিকতর বীভৎস। এ হত্যাকাণ্ড বিশ্ব-সম্প্রদায়ের গােচর-বাহির্ভূত রাখার লক্ষ্যে ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিকদেরও ২৫ মার্চ রাতে হােটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আটক রাখা হয় এবং ২৬ মার্চ সকালে তাদেরকে বিদেশ প্রত্যাবর্তনে বাধ্য করা হয়।

 

বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে পাকিস্তানি শাসকেরা পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পূর্বেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘােষণা ও যুদ্ধকালীন করণীয় সম্পর্কে সঠিক নির্দেশনা দিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা অনুযায়ী মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় এবং পরিচালিত হয়। বঙ্গবন্ধু বুঝেছিলেন শুধু অস্ত্র দিয়ে দেশ স্বাধীন করা যাবে না। তাছাড়া সারা বিশ্বের সমর্থন লাভের জন্য একটি সরকার ব্যবস্থা প্রয়ােজন। তা না হলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে পাকিস্তান বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা সন্ত্রাসবাদ হিসেবে বিশ্বে প্রচার করত।

 

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘােষণার ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধকে চূড়ান্ত পরিণতি দেওয়ার লক্ষ্যে ১০ এপ্রিল ১৯৭০ এর নির্বাচনে বিজয়ী শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে গঠিত হয় ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের দ্রৈনাথতলায় (যার নামকরণ করা হয় মুজিবনগর) স্বাধীনতার ঘােষণাপত্র পাঠের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি (বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি) এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মুজিবনগর সরকার শপথ গ্রহণ করে। মন্ত্রিসভায় আরও ছিলেন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামান এবং খুনী মােস্তাক । মন্ত্রীর মর্যাদায় জেনারেল এম. এ. জি ওসমানীকে করা হয় প্রধান সেনাপতি। মুজিবনগর দিবসের ঐতিহাসিক এই দিনে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি ভারতের মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতীয় বীর জনতাকে যারা মুজিবনগর সরকারকে অস্ত্র দিয়ে, মুক্তিযােদ্ধাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করে এবং প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে সহযােগিতা করেছে।

 

মুজিবনগর সরকারের মধ্যেও ছিল মীরজাফরদের ষড়যন্ত্র। জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি শাসকদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মুজিবনগর সরকারের অধীনে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ওয়ার কাউন্সিল করে যুদ্ধের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানী জিয়াউর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করে। জিয়া পরে নিঃস্বার্থ ক্ষমা চাইলে তাকে পুনর্বহাল করা হয়। খুনি মােস্তাক পাকিস্তানের সাথে লুজ কনফেডারেশন' করে পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

 

সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে মুজিবনগর সরকার সঠিক নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিল বলেই আমরা এত স্বল্প সময়ের মধ্যে মাতৃভূমিকে হানাদার মুক্ত করতে পেরেছিলাম। ঐতিহাসিক এই মুজিবনগর দিবসে মুজিবনগর সরকার পরিচালনাকারী সকল নেতৃবৃন্দের প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ সালাম এবং কৃতজ্ঞতা। শ্রদ্ধা জানাই সকল বীর মুক্তিযােদ্ধা, ৩০ লক্ষ শহিদ, ২ লক্ষ নির্যাতিত মা-বােনদের প্রতি ও তৎকালীন অবরুদ্ধ বাংলায় স্বাধীনতার স্বপক্ষের আপামর জনগণকে ।

 

সূত্রঃ বঙ্গবন্ধুঃ স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা, ড. আনু মাহমুদ