• সোমবার   ২৬ জুলাই ২০২১ ||

  • শ্রাবণ ১০ ১৪২৮

  • || ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

বাবা ভাবতেন মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ২৯ মে ২০২১  

‘খবরটা শোনার পর ঘুম নেই চোখে। অপেক্ষায় আছি মেয়েকে কখন ফিরে পাব। হৃদয়সহ ওর সহযোগীরা আমার মেয়েকে অপহরণ করে বিদেশে পাচার করেছে। শুনেছি, হৃদয় ও তার সহযোগীরা ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছে। ওদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

কথাগুলো বলছিলেন ভারতে পাচারের পর যৌন নির্যাতনের শিকার তরুণীর বাবা। গতকাল শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে রাজধানীর মগবাজারে তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। মেয়েটির বাবা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার তিন সন্তান। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে শরবত বিক্রি করে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। জামাই বিদেশে থাকে। ভেবেছিলাম মেয়ে চাঁদপুরে শ্বশুরবাড়িতে আছে। এখন মেয়েকে পাচারের খবর জানতে পেরে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে।’

সন্তানের চিন্তায় ব্যাকুল বাবা বলেন, ‘ওর তিন বছর বয়সী একটি মেয়েসন্তান রয়েছে। সাড়ে তিন বছর আগে জামাই কুয়েতে গেলে মেয়েটি মাঝেমধ্যে ঢাকায় এসে থাকত। ওর জীবনটা ভালোই চলছিল। প্রায় এক বছর হলো মেয়ের সঙ্গে আমার দেখা নেই। দেড় বছর আগে মেয়েটি মগবাজারে ওর স্বামীর বন্ধু হৃদয়ের মাধ্যমে দুবাই যাওয়ার ভাবনার কথা জানালে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু আমার অভাবের কথা তুলে ধরে জোরাজুরি করলে পরে রাজি হই। শুনেছি আমার মেয়ের অপহরণকারী হৃদয়সহ অন্য অপরাধীরা ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে মেয়ের খবর এখনো পাইনি। মেয়েকে ফিরে পেতে আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানাই।’

এদিকে বাংলাদেশি তরুণীকে ভারতে নিয়ে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতের বেঙ্গালুরু পুলিশ। এর আগে ওই ঘটনায় ওই পাঁচজনের ছবি দিয়ে তাদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছিল আসাম পুলিশ। তাদের মধ্যে গতকাল ভোর রাতে পালাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে দুজন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই তরুণীকে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে ভারতে পাচার করে যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এর আগে ঢাকার মগবাজারের রিফাদুল ইসলাম হৃদয় ওরফে টিকটক হৃদয় ওই তরুণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে।

ওই ঘটনায় ঢাকার হাতিরঝিল থানায় মানবপাচার ও পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেছেন নির্যাতনের শিকার মেয়েটির বাবা। মামলায় আসামি করা হয় হৃদয় ও অজ্ঞাতনামা আরো চারজনকে। মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘প্রায় এক বছর আগে আমার মেয়েকে অপহরণ করে বিদেশে পাচার করে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। সেই নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’

হাতিরঝিল থানার ওসি আব্দুর রশীদ বলেন, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে এই মামলার আসামি হৃদয়সহ কয়েকজনকে ভারতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, টিকটক হৃদয়ের সঙ্গে ওই নারীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয়। হৃদয় তাঁকে ভালো বেতনে চাকরিসহ বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পাচার করে যৌনপল্লীতে বিক্রি করে দেয়।

কে এই টিকটক হৃদয় :  গতকাল মগবাজার ও হাতিরঝিল এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টিকটক হৃদয়ের বাবার নাম আবুল হোসেন। নয়াটোলা (বউবাজার) এলাকায় একসময় মা-বাবার সঙ্গেই থাকত। স্থানীয় লোকজন তাকে বরাবর বখাটে হিসেবেই চেনে। সে ভারতে যাওয়ার আগে একটি গ্রুপ নিয়ে হাতিরঝিল এলাকায় টিকটক করে বেড়াত। এক প্রতিবেশী জানান, হৃদয় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। এই বখাটে মেয়েদের রাস্তায় উত্ত্যক্ত করত। কোনো কাজ না করায় মা তাকে চার মাস আগে বাড়ি থেকে বের করে দেন। দেশে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে রমনা থানায় ডাকাতি প্রস্তুতির একটি মামলা হয়েছিল।

হৃদয়ের চাচা বাবুল মিয়া বলেন, ‘বখাটে হওয়ায় হৃদয়কে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। অনেক দিন ধরেই আমরা ওর খোঁজ পাচ্ছিলাম না। পরবর্তী সময়ে জানতে পারি যে সে ইন্ডিয়ায় রয়েছে।’

ভারতে গ্রেপ্তার ছয়জন : এদিকে ওই তরুণীকে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার ঘটনায় ভারতের বেঙ্গালুরুতে ছয়জন গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের মধ্যে হৃদয়সহ দুজন পালানোর চেষ্টার সময় গুলিতে আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বেঙ্গালুরু পুলিশ।

এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে গতকাল বলা হয়, ওই তরুণীর বিষয়ে কিভাবে কী ঘটেছিল, তা জানতে গ্রেপ্তার ছয়জনকে গতকাল ভোর ৫টার দিকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়েছিল পুলিশ। সেখানেই গুলির ঘটনা ঘটে।

পূর্ব বেঙ্গালুরু পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শরণাপ্পা এসডিকে উদ্ধৃত করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ক্রাইম সিন থেকে দুজন পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি ছোড়ে। পরে বেঙ্গালুরু পুলিশকে উদ্ধৃত করে এনডিটিভি জানায়, নির্যাতনের ওই ঘটনাটি ঘটেছে ছয় দিন আগে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি দেখার পর প্রথম পদক্ষেপ নেয় আসাম পুলিশ। ওই ভিডিও থেকে পাঁচ নিপীড়কের ছবি প্রকাশ করে তাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য টুইটারে পুরস্কার ঘোষণা করে পুলিশ।

হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, ওই ভিডিওর উৎস খুঁজতে গিয়ে আসাম পুলিশ জানতে পারে যে নির্যাতনে জড়িতরা বেঙ্গালুরুতে রয়েছে। তারপর সেই তথ্য কর্ণাটক পুলিশকে সরবরাহ করে তারা। পরে বেঙ্গালুরু পুলিশ ওই ভিডিওর সূত্র ধরে ছয়জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ বলেন, এরই মধ্যে তারা জানতে পেরেছেন যে হৃদয়সহ ছয়জন ভারতে গ্রেপ্তার হয়েছে। নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী ও নির্যাতনকারীদের একজন ঢাকার মগবাজার এলাকার বাসিন্দা। তবে ঘটনাটি ঘটেছে ভারতের কেরালায়। সাইবার প্যাট্রলের অংশ হিসেবে ভিডিওটি পুলিশের নজরে আসে।