• মঙ্গলবার   ০৫ জুলাই ২০২২ ||

  • আষাঢ় ২১ ১৪২৯

  • || ০৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

সাভারে যথেচ্ছা এন্টিবায়োটিক ব্যবহার রোধে এখনই সময়

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ২৭ মে ২০২২  

শিল্পাঞ্চল হওয়ায় অন্য উপজেলার তুলনায় ঢাকার সাভার উপজেলায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক বেশী মানুষ বসবাস করে। আর লক্ষ লক্ষ এসব মানুষের মাঝে নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে এন্টিবায়োটিক এর যথেচ্ছা ব্যবহার। আর এসব এন্টিবায়োটিক অধিকাংশই বিক্রী হচ্ছে পল্লী চিকিৎসকদের মাধ্যমে।

স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করতে গিয়ে তারা এসব এন্টিবায়োটিক দেদারসে রোগীদের বিক্রী করছেন। কেউ কেউ প্রেসক্রাইব করেও চিকিৎসা করছেন যদিও তারা এটি করতে পারেন না। এসব পল্লী চিকিৎসকদের অনেকেই আবার তাদের নামের আগে ডাক্তার পদবী ব্যবহার করে প্রতারিত করছেন সাধারণ মানুষকে। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন পোশাক শিল্প কারখানার স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিকেরা। ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে অসংখ্যবার।

উল্লেখ্য, ডাক্তার পদবী ব্যবহারের ও কিছু আইন রয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিল অ্যাক্ট ২০১০(২০, ডিসেম্বর ২০১০-এ প্রকাশিত গেজেট) এর ধারা ২২(১) ও ২৯(১) এর আওতায় এমবিবিএস /বিডিএস বাদে অন্য চিকিৎসকদের নামের আগে ডাঃ (ডাক্তার) পদবী ও নামের পরে ডিগ্রী ব্যবহার অপরাধ।

ন্যূনতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রিধারী ব্যতীত অন্য কেউ তাদের নামের পূর্বে ডাক্তার পদবী লিখতে পারবেন না। তাও আবার তাকে বিএমডিসি’র রেজিস্ট্রেশনভুক্ত হতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটানো শাস্তি যোগ্য অপরাধ হবে।

কিন্তু সাভারের বিভিন্ন এলাকায় এখনও অনেক পল্লী চিকিৎসক তাদের নামের পূর্বে ডাঃ পদবী লাগিয়ে স্বল্প শিক্ষিত মানুষদের প্রতারণা করছেন এবং আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তাদেরকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছেন। মূলত এদের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের মাঝে যথেচ্ছা এন্টিবায়োটিক এর ব্যবহার চলছে।

সরেজমিন সাভারের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বিষয়টির সত্যতা পাওয়া যায়। আশুলিয়া ইউনিয়নের বেলমা এলাকার জামান ফার্মেসিতে বসেন মোঃ মনির-উজ-জামান। বিশাল সাইনবোর্ডে তার নামের পূর্বে ডাঃ লাগানো দেখতে পাওয়া গেছে। নিচে লেখা ডিএমএএফ (ডিপ্লোমা), এলএমএএফ, ঢাকা। তিনি আবার শিশু ও মেডিসিন অভিজ্ঞ! নামের সাথে ডাঃ লাগিয়ে প্রেসক্রিপশন দিয়ে রোগীও দেখেন।

পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় সাইমন মেডিসিন কর্ণার এন্ড ডক্টর’স চেম্বারে বসেন সোলাইমান ইসলাম নামের আরএমপি ডিগ্রিধারী আরেক পল্লী চিকিৎসক। তিনিও নামের আগে ডাঃ পদবী লাগিয়ে প্রেসক্রিপশন দিয়ে রোগী দেখেন। তার প্রেসক্রিপশনে আবার লেখা রয়েছে চর্ম, যৌন, এলার্জি, মা ও শিশু রোগে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত!

এভাবেই এরা আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভুয়া ডাক্তার পদবী ব্যবহার করে চিকিৎসা সেবা প্রদান করছে। আর এদের শিকার হচ্ছেন স্বল্প শিক্ষিত শ্রমিকেরা ও তাদের পরিবারের সদস্যগণ। যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেই এরা অবাধে এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করে বিক্রী করছেন। বিভিন্ন এলাকায় এরকম আরও অনেকে রয়েছেন যাদের কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে সাভারের এসব সাধারণ মানুষ।

বিষয়টি নিয়ে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ সায়েমুল হুদার সাথে কথা হয়। এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রী করা অপরাধ।

আর ফুল কোর্স ছাড়া এন্টিবায়োটিক বিক্রী করা যাবে না। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ শুরু করতে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

নামের আগে ডাঃ পদবী লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণা এবং বিশেষজ্ঞ না হয়ে ভুল চিকিৎসার বিষয়ে ডা. হুদা বলেন, সাভার উপজেলায় প্রায় ৭-৮ হাজারের অধিক পল্লী চিকিৎসক আছেন। করোনাকালীন সময়ের শুরু থেকে উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে তাদেরকে সাথে নিয়ে আমরা কাজ করছি। সাধারন মানুষের অভিযোগ ছিল পল্লী চিকিৎসকগণ নামের পূর্বে ডাঃ লিখে মানুষকে প্রতারিত করেন। বিষয়টি আমি আমলে নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে তাদের নেতাদের সাথে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়সহ বসে মত বিনিময় সভা করে তাদের বুজাতে সক্ষম হয়েছি, কারা নামের পূর্বে চিকিৎসক লিখতে পারবে আর কারা পারবে না।

তিনি বলেন, এখন প্রায় শতভাগ সাভার উপজেলার পল্লী চিকিৎসকগণ নামের পূর্বে ডাঃ লিখেন না, বরং কেউ লিখলে তারাই প্রতিবাদ করেন এবং আমাকে অবহিত করেন।

সম্প্রতি দেড় হাজার পল্লী চিকিৎসকগণ কথা দিয়েছেন তারা নামের পূর্বে ডাঃ লিখবেন না এবং যথেচ্ছা এন্টিবায়োটিক এর ব্যবহার করবেন না। প্রসঙ্গক্রমে তিনি জানান, বর্তমানে এন্টিবায়োটিক এর ‘রেজিস্টেন্স’ প্রায় ৬৮%! একটা সময় মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে, শুধু দেখবেন কিন্তু কিছু করার থাকবে না। তাই এবিষয়টি নিয়ে এখনই কাজ শুরু করা প্রয়োজন।

ভুয়া ডিগ্রী ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে করণীয় সম্পর্কে সায়েমুল হুদা বলেন, মানুষকে বুঝাতে পারলে মানুষ বোঝে এবং তা মানে। তাই কাউন্সেলিং এর বিকল্প নেই। জেল জরিমানা কতজনকে দিবেন? সাভারে এই যে ৭/৮ হাজার পল্লী চিকিৎসক কাজ করছেন, এদেরকে ভালোবেসে, তাদের সম্মান রেখে তাদেরকে বললে তারা এগুলো আর করবেন না। এন্টিবায়োটিক এর অপব্যবহার রোধে তারাও আমাদের সাথে থেকে কাজ করবেন। সাভার উপজেলা প্রশাসন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সাধারণ মানুষের সহযোগিতা নিয়ে আমরা সেই দিকেই এগোচ্ছি।