• সোমবার   ২৩ মে ২০২২ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪২৯

  • || ২২ শাওয়াল ১৪৪৩

বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রধানতম স্তম্ভ স্বাধীন নির্বাচন কমিশন

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ২৬ জানুয়ারি ২০২২  

অবাধ নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার জন্য বহুমুখী প্রতিবন্ধকতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে বাংলাদেশকে। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য স্বাধীনতার মাত্র ৯ মাসের মাথায় সংবিধান প্রণয়ন করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই সংবিধানের মাধ্যমেই তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের। পরবর্তীতে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ডিজিটাইজড হয়। ইতোমধ্যে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচন কমিশনের জন্য স্থায়ী সচিবালয় এবং নির্বাচন কমিশনের জন্য আর্থিক স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা করা দরকার তার প্রায় সব-কিছুই পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যার প্রতিফলন আমরা সম্প্রতি স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও দেখতে পাচ্ছি। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার এই পথ অতো সহজ ছিল না। বাধার পাহাড় পেরিয়ে যেতে হয়েছে আজকের এই অবস্থানে আসার জন্য।

আমরা ইতোমধ্যে জানি যে, নির্বাচন কমিশনে কারা থাকবেন তা নির্ধারণ করার জন্য একটি সার্চ কমিটি গঠনের বিধানও  করা হয়েছে। যেই কমিটির মাধ্যমে দেশের সংবিধান ও আইন অনুসারে সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিদের নির্ধারণ করা হবে এবং এরপর মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগদানের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া গৃহীত হয়েছে। একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সংস্কার এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার উন্নয়নে যে সব গুণগত পরিবর্তন এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কর্তৃক দেশ পরিচালনার সময়ে।

১৯৭২ সালে সংবিধানের মাধ্যমে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধুঃ 

স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র ৯ মাসের মাথায়, ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান সংযোজিত করেন বঙ্গবন্ধু। সে সময় বিশ্বের অনেক দেশেই নির্বাচন পরিচালনার বিষয়টি নির্বাহী বিভাগের হাতেই রাখা হতো। কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা লক্ষ্যে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের উপর নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করেন।

সংবিধানের এই বিধানে কোনরূপ আইনি অস্পষ্টতা ছাড়াই একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠার বিধান প্রণীত হয়। সেসময় গণতান্ত্রিক বিশ্বে এটি উদ্যোগ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালে The Representation of the People Order (RPO)  প্রণয়ন করেন।  

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নির্বাচন কমিশনকে ধ্বংস করে স্বৈরাচাররাঃ 

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশ পুননির্মাণের প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেয় কুচক্রীরা। অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেয় জিয়াউর রহমান। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীন নির্বাচন ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ে। শুরু হয় অসাংবিধানিক স্বৈরশাসনের যুগ।

১৯৭৭ সালের ৩০ মে হ্যাঁ/না ভোটের আয়োজন করে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়। স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের নিয়োজিত সন্ত্রাসী বাহিনী গণহারে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রায় শতভাগ সিল মারে। পরবর্তীতে অপর স্বৈরশাসক হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদও একই পন্থা অবলম্বন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। ফলে দেশের গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি ও পরিবেশ বিনষ্ট হয়ে যায়।

শেখ হাসিনার হাত ধরে আবারো নির্বাচন ও গণতন্ত্র ফিরে আসে দেশেঃ 

স্বৈরাচারদের অপশাসন থেকে দেশবাসীকে ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ১৯৮১ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে আপামর জনতাকে সাথে নিয়ে গড়ে তোলেন গণআন্দোলন। ফলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর জিয়াউর রহমানের হাত ধরে শুরু হওয়া স্বৈরাচারি অপশাসনের অবসান ঘটে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর আরেক স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের মাধ্যমে।

১৯৯১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের সমর্থনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সক্ষম হয় বিএনপি। ফলে আওয়ামী লীগ চলে যায় বিরোধী দলে। তবে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবেই রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন ব্যবস্থা থেকে বাংলাদেশের সরকার ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফিরিয়ে আনতে অগ্রভূমিকা রাখেন শেখ হাসিনা। এরপর ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া শুরু হলেও, এর কার্যকর প্রতিফলন ঘটতে শুরু করে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় হতে।

নিজেদের সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে নির্বাচনের আয়োজন করেছিল বিএনপিঃ 

১৯৯১ সালে রাজাকার-জামায়াতদের সহায়তায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পর আবারো নির্বাচন কমিশনকে পাশ কাটিয়ে চলতে শুরু করেন খালেদা জিয়া। সরকারে অধিষ্ঠিত হয়েই খালেদা জিয়া তার স্বামী স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের পথ অনুসরণ করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আবারও কলুষিত করে তোলেন।

ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ঢাকা (মিরপুর ও তেজগাঁও) ও মাগুরার উপ-নির্বাচনে বিএনপির দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনী লেলিয়ে দেন তিনি। এমনকি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি দলীয় ক্যাডারদের ব্যবহার করে একদলীয় নির্বাচনের আয়োজন করে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন খালেদা জিয়া। ফলে জনগণ সেই নির্বাচন প্রত্যাখান করে। তবে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে এক কলঙ্কিত অধ্যায় সৃষ্টি হয় খালেদা জিয়ার হাত ধরে। তবে আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত আন্দোলনের মুখে ৩০ মার্চ পদত্যাগে বাধ্য হন খালেদা জিয়া।

ভোটার তালিকায় ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার যুক্ত করেছিল বিএনপি-জামায়াতঃ 

১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ ২১ বছর পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন দলের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বস্তরে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়। একটি স্থায়ী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন ব্যবস্থাপনার গুণগত পরিবর্তন আনার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অপশাসনের প্রতিবন্ধকতা অপসারণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়া ছিল খুবই কষ্টকর।

স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্রের কারণে ২০০১ সালে বিএনপি আবারো ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ কর্তৃক গৃহীত সংস্কারের সব উদ্যোগ বন্ধ করে দেয়। এমনকি পরবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার দিয়ে ভোটার তালিকা প্রনয়ণ করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। এরপর ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি আরেকটি প্রহসনমূলক নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করে। নির্বাচন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি নিকৃষ্টতম প্রহসন এটি। ফলে দেশজুড়ে গণ-আন্দোলনের মুখে ২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোটের পতন ঘটে।

আওয়ামী লীগের দাবির মুখে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা ও স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স চালুঃ 

বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার তালিকার বিষয়টি ধরা পড়ার পর, নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় অধিকতর স্বচ্ছতার দাবি জানায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে প্রবল জনমতের চাপে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে ১৪ দলের দাবিগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, নির্বাচনে পেশীশক্তি ও অর্থের ব্যবহার বন্ধ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ ইচ্ছুক প্রার্থীর সম্পদের বিবরণী প্রকাশ, চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরপরই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ করা, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাধ্যমে সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধির তালিকা প্রণয়ন এবং সেখান থেকে মনোনয়ন প্রদান, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্য থেকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

এসব প্রক্রিয়ায় যাচাইয়ের পর বিএনপি-জামায়াত জোটের করা ভোটার তালিকা হতে ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার বাদ দেওয়া হয়। এবং ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয় লাভ করে সরকার গঠন করে। এরপরেই নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, আইন সভা ও নির্বাহী বিভাগসহ সর্বস্তরে প্রাতিষ্ঠানিক উন্নতি সাধনে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে শুরু করে।

সর্বদলীয় অন্তবর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন, সংলাপ ও রাজনৈতিক দলের ভূমিকাঃ 

২০০৮ সালের ডিসেম্বরে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জেতার পরেও, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে সর্বদলীয় অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ। নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সুষ্ঠু রাখার জন্য শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের অধীনে সব দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।  

নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান। এমনকি তাদের পছন্দনীয় নির্বাহী বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণেরও প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও দেশের আইন-কানুনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন।

সুষ্ঠু ভোট হলে নিজেদের পরাজয় বুঝতে পেরে, বিএনপি-জামায়াত কৌশলে সর্বদলীয় নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকে এবং নির্বাচন বানচালের জন্য দেশজুড়ে নাশকতা শুরু করে। থানা লুট থেকে শুরু করে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সাধারণ মানুষের বাড়ি-ঘর ও যানবাহনে পেট্রোল বোমা ও নজিরবিহীন অগ্নিসন্ত্রাস চালায় বিএনপি-জামায়াত। তাদের দুর্বৃত্তায়নের ফলে প্রাণ হারায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২৩ জন সদস্য। পেট্রোলে পুড়িয়ে তারা হত্যা করে দুই শতাধিক মানুষকে। মারাত্মকভাবে আহত হয়ে পঙ্গুত্বের শিকার হতে হয় দুই সহস্রাধিক সাধারণ জনগণকে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এই অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, ফলে একপর্যায়ে বর্বরতা থামাতে বাধ্য হয় তারা।

বিএনপি-জামায়াতের নাশকতার কারণে এসময় রাষ্ট্রের ক্ষতি হয় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে আরো প্রায় ১০টি পদ্মা সেতুর মতো স্থাপনা তৈরি করা সম্ভব হতো।

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগেও সর্বদলের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের প্রচেষ্টা চালান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। যার একমাত্র লক্ষ্য ছিল গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের পরিবেশ সুনিশ্চিত করা। কিন্তু সংলাপে অংশগ্রহণকারী বিএনপি ও তাদের জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলো দূরভিসন্ধিমূলকভাবে রাজনৈতিক সংলাপের সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করতে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশে নানা ধরনের গুজব, অপপ্রচার চালিয়ে নির্বাচনি পরিবেশ ভণ্ডুল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে।

শুধু তাই নয়, বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনের মাঠে জনসংযোগ ও প্রচারণায় না নেমে, উল্টো সেই নির্বাচন বানচাল করার জন্য পূর্ব-পরিকল্পিতভাবে আন্তর্জাতিক অপপ্রচারে লিপ্ত হয় এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালায়।

গণতন্ত্র, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ও আওয়ামী লীগঃ 

নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে যেহেতু দেশে কোনো সুনির্দিষ্ট আইন বিদ্যমান নেই, সেহেতু এই সংক্রান্ত যেকোনো আইন হবে সংবিধান মতে একটি বিশেষ ধরনের আইন। এই আইন প্রণয়নের জন্য আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো সুনির্দিষ্ট উদাহরণ ছিল না। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে একটি রাজনৈতিক মতৈক্য প্রতিষ্ঠা করতে একমাত্র বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই একটি সাংবিধানিক রীতি ও রাজনৈতিক অনুশীলন (Constitutional Convention) প্রতিষ্ঠা করেছে।

এই সাংবিধানিক রীতিটি হলো সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে সকলের মতামত ও অংশগ্রহণে নির্বাচন কমিশন গঠন। যেহেতু এই সাংবিধানিক রীতি এখন পর্যন্ত দুই বার অনুশীলন করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী কমিশন গঠন করা হয়েছে, সেহেতু আইন প্রণয়নের জন্য এটি একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে সর্বসম্মত বলেই পরিগণিত হয়। এমতাবস্থায়, এই রীতিটির আলোকে এবং এই প্রক্রিয়ালব্ধ অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিশেষ আইন সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদের আলোকে প্রণয়ন করা যেতে পারে। এরপরেও যদি কোনো গোষ্ঠী বা সংস্থা দেশের সংবিধান বা বিরাজমান আইন-কানুনের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে, তা দেশের শান্তিকামী জনগণ কখনই মেনে নেবে না।

নির্বাচন কমিশনকে কোনো বাহিনী, সংস্থা বা গোষ্ঠীর প্রভাব থেকে দূরে রাখতে এবং স্বতন্ত্র ভূমিকা পালনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে। যার ফলে জাল ভোটের সংস্কৃতি দূর হয়েছে দেশ থেকে।

এখন প্রত্যেক নিবন্ধিত ভোটারের জন্য বায়োমেট্রিক জাতীয় পরিচয়পত্র প্রণয়ন, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও  ই-ভোটিং-এর প্রবর্তন, নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার রোধে নানাবিধ আইন ও বিধি প্রণয়ন, নির্বাচনি আচরণ বিধিমালা তৈরি, তৃণমূলের ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই, দেয়াল লিখন ও রঙিন পোস্টারের পরিবর্তে সাদা-কালো পোস্টারের প্রবর্তন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় স্থাপন এবং নির্বাচন কমিশনকেই তাদের নিজস্ব জনবল নিয়োগের ক্ষমতা অর্পণ, প্রয়োজনীয় আর্থিক তহবিল প্রদান, সাধারণ প্রশাসনের উপর নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধান, নির্বাচনি অপরাধ প্রতিরোধে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-এর নেতৃত্বে পর্যাপ্ত সংখ্যক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং যানবাহনের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামগ্রিক নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় যে দৃশ্যমান উন্নতি সাধিত হয়েছে, তার সব কিছুর মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগ কর্তৃক উপস্থাপিত ২৩-দফা।

২০১৯ সালে Representation of the People (Amendment) Act 2019’ প্রণয়ন করা হয়, যার উদ্দেশ্য EVM পদ্ধতি প্রবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচনি ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করে আর্থিক সাশ্রয়, দ্রুততম সময়ে নির্বাচন সম্পাদন ও সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করা। এই আইনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে EVM পদ্ধতি প্রবর্তন করার লক্ষ্যে এবং সরাসরি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পাশাপাশি অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া ২০২১ সালের ১ জুলাই আরপিও’র নির্ভরযোগ্য বাংলা পাঠ (অনুবাদ) প্রণয়ন করা হয়েছে।

EVM-এর মাধ্যমে ভোটগ্রহণের জন্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) বিধিমালা, ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০২১ সালে বাংলায় নতুন একটি আইন প্রণয়ন করা হয়, যার শিরোনাম ‘জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ আইন, ২০২১’। 

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ‘নির্বাচন কমিশন আইন-২০০৯’ প্রণয়ন করে নির্বাচন কমিশনের আইনগত ক্ষমতা, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা শুধু বৃদ্ধিই করেনি পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে সকল কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

এমনকি বিদেশে অবস্থানরত প্রায় এক কোটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ‘ভোটার তালিকা বিধিমালা, ২০১২’-তে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয়েছে। প্রবাসীদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য একটি নীতিমালাও প্রণয়ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছ থেকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন গ্রহণের জন্য অনলাইন পোর্টাল উদ্বোধন করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের পথ সুগম হবে।