• মঙ্গলবার   ২৪ মে ২০২২ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪২৯

  • || ২২ শাওয়াল ১৪৪৩

উচ্ছেদের পর ফের দখল নদীর পার

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারি ২০২২  

রাজধানীর চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা নদীর দুই পার অবৈধভাবে দখল করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন স্থাপনা। দখল-দূষণে বুড়িগঙ্গা নদী সংকুচিত হতে হতে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। তুরাগ ও বালু নদ পরিণত হয়েছে সরু খালে। বুড়িগঙ্গার দুই পার দখল করে অনেক স্থানে চলছে ইট-বালুর ব্যবসা।

পোস্তগোলা ও শ্যামপুর এলাকায় নানান কায়দায় বুড়িগঙ্গার দুই পার দখল করে বিশাল এলাকাজুড়ে দখলদাররা গড়ে তুলেছেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। দখলদারদের অবৈধ দখলের কারণে অনেক স্থানে আর আদি বুড়িগঙ্গা খুঁজে পাওয়া যায় না। বুড়িগঙ্গা দখল করেই বিস্তৃত হয়েছে কামরাঙ্গীর চর এলাকা। এই নদ ও নদীগুলো রক্ষায় তিন বছর ধরে অভিযান পরিচালনা করছে ঢাকা জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ)। একদিক থেকে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করার পর অন্যদিক থেকে দখলদাররা ফের গড়ে তুলছেন স্থাপনা। ফলে কিছু সময় পর অনেক স্থানে বোঝাই যায় না সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছিল।

বিআইডাব্লিউটিএর বন্দর ও পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর চারপাশের নদীর পারে গড়ে তোলা ৭,৭৯৬টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। এ সময় ১৭৬.২৭ একর জমি উদ্ধারের পাশাপাশি ৫০০ টন বর্জ্য অপসারণ এবং এক লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হয়েছে। আর মামলা হয়েছে দুটি। এই মামলায় ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশনায় গত বছর ২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় দিনে কামরাঙ্গীর চর এলাকার বেড়িবাঁধসংলগ্ন, শহীদনগর, লোহারব্রিজ, বউবাজার এলাকা থেকে ২১৯টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু এক মাস না যেতেই উচ্ছেদ করা স্থানে এখন আবার শুরু হয়েছে স্থাপনা নির্মাণকাজ।

সরেজমিনে গত রবিবার কামরাঙ্গীর চর লোহারব্রিজ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ভেঙে ফেলা টিনশেডের ঘরগুলো ফের গড়ে তোলা হয়েছে। আর উদ্ধার করা স্থানে খোলা আকাশের নিচে ফের শুরু হয়েছে ফার্নিচার বেচাবিক্রি। ফাঁকে ফাঁকে চলছে স্থাপনা গড়ে তোলার কাজও। ২৪/৮ শহীদনগরে শাহজাহান ফার্নিচারের দোকানটি চলছিল খোলা আকাশের নিচে। জানতে চাইলে দোকানের এক কর্মী জানান, আগে ওখানে যে ভবন ছিল, তাতে তাঁদের ব্যবসা চলত। উচ্ছেদ অভিযানে ভবনটি ভেঙে ফেলায় এখন তাঁরা খোলা আকাশের নিচে ব্যবসা করছেন। একটু পেছনে গিয়ে দেখা গেল সেখানে ফের স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়েছে। ইটের গাঁথুনি দিচ্ছেন একজন রাজমিস্ত্রি ও তাঁর সহযোগী।

পাশের ২৪/৬-বি হোল্ডিংয়ে নিউ বন্ধু ফার্নিচার দোকানের দুই পাশে ফের তোলা হচ্ছে ভবনের দেয়াল। পেছনে নিচ থেকে বিম ঢালাইয়ের পর চলছে পিলার ঢালাইয়ের কাজ।

পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটের একটু পশ্চিমে চাঁদনীঘাট এলাকায় দুই ভাগ হয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গার উত্তর দিকের শাখাটি আদি চ্যানেল হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণের শাখাটি এখনকার মূল বুড়িগঙ্গা। বুড়িগঙ্গার এই দুই শাখার মাঝখানে কামরাঙ্গীর চরের অবস্থান। সেখানে আদি চ্যানেলের পুরোটাই এখন ভরাট। পরিবর্তে গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর, বহুতল ভবন। দুই দশক আগেও এই চ্যানেলটি হাজারীবাগ, রায়েরবাজার ও মোহাম্মদপুরের পাশ দিয়ে বুড়িগঙ্গার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

২০১৯ সালের মাঝামাঝি কামরাঙ্গীর চরের কুড়ার ঘাট এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ওই সময় বুড়িগঙ্গার পার থেকে ভেতরে প্রায় ৪০ ফিটের মতো জায়গা দখলমুক্ত করা হয়। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, আবারও দখল হয়ে গেছে ওই জায়গা। এরই মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে আধাপাকা ভবন। পুনরায় উচ্ছেদ করা হলে যাতে কম ক্ষতি হয় সে জন্য এই কৌশল নিয়েছেন দখলদাররা।

বেড়িবাঁধ সড়কের সঙ্গে বউবাজার অংশে স্থানীয় এক প্রভাবশালীর দখল করা পাঁচতলা ভবন বছরখানেক আগে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখানে ইট-লোহা দিয়ে একটি স্থাপনা নির্মাণ করে চালানো হচ্ছে একটি ট্রেডিং কম্পানির ব্যবসা।

অভিযানে উদ্ধার করা নদীর পার যেন ফের দখল করা না হয়, সে জন্য সীমানা খুঁটি স্থাপনসহ বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পার উন্নয়নে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় সীমানা খুঁটি স্থাপনসহ ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। তুরাগের পারে এরই মধ্যে তিন কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। তবে নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ওয়াকওয়ে এবং সীমানা খুঁটির বাইরেও রয়েছে নদীর জায়গা, যা এখনো দখলমুক্ত করা যায়নি।

রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ  বলেন, ‘উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গে যদি মাটি সরিয়ে নদীর জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া না যায় তবে দখলদাররা ফের স্থাপনা গড়ে তুলবেনই। উচ্ছেদ কার্যক্রম অবশ্যই প্রশংসার। তবে এর মধ্যে সমতার ঘাটতি রয়েছে। তুরাগের বিভিন্ন অংশে বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কারখানা উচ্ছেদ করা হয়নি। আর ওয়াকওয়ে ও সীমানা খুঁটির বাইরেও নদীর যে জায়গা রয়েছে তাও উদ্ধার করা হয়নি। ’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরিফ জামিল বলেন, ‘আদালতের রায় অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ করে দখলদার চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে। এরপর কোন দখলদারকে কিভাবে উচ্ছেদ করা হবে সেটি পরিকল্পনা করতে হবে। এসব না করে উচ্ছেদ অভিযান করা হচ্ছে। এটি ফলপ্রসূ না হওয়াই স্বাভাবিক। ’

উচ্ছেদের পর রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে বিআইডাব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক (ঢাকা নদীবন্দর) গুলজার আলী বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ ছিল আমরা যাতে উচ্ছেদ করে দিই। আমরা সেটি করে দিচ্ছি। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সিটি করপোরেশন বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বলেন, ‘বিআইডাব্লিউটিএর উচ্ছেদ করা জায়গাগুলো আমরা বুঝে নিচ্ছি। সেখানে সীমানা পিলার দেওয়া হবে। ’ উচ্ছেদ করা জায়গা ফের দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এত দিন বিচ্ছিন্নভাবে কাজ হয়েছে। তাই এমনটা হচ্ছে। এবার নদীর জায়গায় সীমানা পিলার দিয়ে একযোগে উচ্ছেদ করা হবে। এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। উচ্ছেদের কাজটি বিআইডাব্লিউটিএ করবে। সিটি করপোরেশন তাদের সহায়তা দেবে। ’