• রোববার ২১ জুলাই ২০২৪ ||

  • শ্রাবণ ৬ ১৪৩১

  • || ১৩ মুহররম ১৪৪৬

পিপিপি’র পাইপলাইনে নতুন ১৩ মেগা প্রকল্প

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ১ জুন ২০২৩  

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) কাজকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এজন্য নতুন অর্থবছরের পাইপলাইনে থাকছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল-২ নির্মাণসহ নতুন ১৩ মেগা প্রকল্প। এসব বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫১ হাজার ৯৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। তবে চলমান ও নতুন মিলে ৭৯টি উন্নয়ন প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে পিপিপির তালিকায়।

সবকটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) থাকছে এই তালিকা। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক অর্থবছরেই যে এসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে, বিষয়টি এমন নয়। সরকার এসব প্রকল্প পিপিপির মাধ্যমে বাস্তবায়নে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখান থেকে কোনো বেসরকারি উদ্যোক্তা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আগ্রহী হলে পিপিপি অথরিটির মাধ্যমে সেই প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ করা হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে পিপিপি আইন হয়েছে। একটি অফিস হয়েছে, কিছু প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু পিপিপি কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা তৈরিতে টেকসই কোনো অগ্রগতি হয়নি। একসময় একজন দক্ষ সিইও আনা হয়েছিল। তিনিও বেশি দিন কাজ করতে পারেননি।

বেসরকারি বিনিয়োগকারী সরকারি নিয়ন্ত্রণে থেকে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না, এটাই স্বাভাবিক। আমলারা যদি ঠিক করে দেন এই খাতে, এই শর্তে বিনিয়োগ করতে হবে, আবার প্রকল্পে সরকারি নিয়ন্ত্রণও থাকবে; তাহলে তো কেউ আসতে চাইবে না। এক্ষেত্রে বিজনেস মডেলটা পরিবর্তন করতে হবে। এখানে এডিপির মডেলে প্রকল্প নিয়ে কিছুই হবে না। কেননা এক্ষেত্রে লাভ এবং ঝুঁকি দুটোই আছে।

ঝুঁকিগুলো কে কীভাবে নেবে, লাভ কার কতটুকু হবে-এসব বিষয় স্পষ্ট করে দ্বিপাক্ষিক সমান সুবিধা থাকতে হবে। এককথায় বলা যায়, উইন উইন সিচুয়েশন হতে হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এডিপির তালিকায় থাকা পিপিপি প্রকল্পের মধ্যে ১৫টি আছে প্রকিউরমেন্ট (কেনাকাটা) পর্যায়ে। এছাড়া চুক্তি স্বাক্ষর-পরবর্তী শর্ত প্রতিপালনাধীন পর্যায় রয়েছে সাতটি, অপারেশনাল পর্যায়ে দুটি, বিস্তারিত সমীক্ষা চলছে ২৭টির এবং চুক্তি স্বাক্ষর পর্যায়ে রয়েছে একটি প্রকল্প।

আরও আছে নির্মাণাধীন পর্যায়ে সাতটি, অপারেশনাল পর্যায়ে একটি, পরামর্শক নিয়োগ পর্যায়ে পাঁচটি এবং নীতিগত অনুমোদন-পরবর্তী প্রাথমিক পর্যায়ে ১০টি উন্নয়ন প্রকল্প।

এ প্রসঙ্গে কথা হয় পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের পরিচাললক (ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড প্রমোশন) মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালের সঙ্গে। বুধবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, এখানে যুক্ত করা প্রকল্পগুলো ইতোমধ্যেই সিসিইএ-এর (অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি) অনুমোদন পাওয়া। অর্থাৎ, এগুলোর বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। সেই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক,

এডিবিসহ অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শ নিয়ে আরও প্রকল্প তৈরি করা হচ্ছে। সেগুলো থাকবে আমাদের ওয়েবসাইটে। পিপিপির প্রকল্প সাধারণ প্রকল্পের মতো নয়। এগুলো বাস্তব কাজ শুরুর আগেই ডেভেলপমেন্ট স্টেজ পার করতে প্রায় ৪ বছর লেগে যায়। কেননা প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর আগে পুরো প্রকল্প ব্যয়ের অর্থ একটি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (ফিন্যান্সিয়াল ক্লোজ) রাখতে হয়। ফলে যা সময় লাগার, তা প্রক্রিয়াকরণেই লাগে। বাস্তবায়ন পর্যায়ে কোনো ঝামেলা থাকে না। আগের অনেক কাজেই দক্ষতা অর্জন করেছে পিপিপি।

পিপিপিতে নেওয়া ১৩টি নতুন মেগা প্রকল্প হলো-দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, মিরসরাইয়ে দ্বিতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরিতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ২৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এছাড়া কমলাপুর মাল্টিমোডাল হাবের ব্যয় হবে ২২ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। সার্কুলার রেললাইন নির্মাণে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা। চট্টগ্রামে বে-টার্মিনাল তৈরিতে ১৭ হাজার ৭৫৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে পানি সরবরাহে ১৫ হাজার কোটি টাকা। ঢাকা ইস্ট ওয়েস্ট এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ১৭ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। মেট্রোরেল লাইন-২ নির্মাণে ২৯ হাজার ৫৭১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

ইমপ্রুভমেন্ট অব ঢাকা (জয়দেবপুর)-ময়মনসিংহ হাইওয়ে এক্সপ্রেসওয়েতে ৩ হাজার ৩৫৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কনস্ট্রাকশন অব আউটার রিংরোডের ব্যয় ১২ হাজার ৯৯৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আপগ্রেডেশেন অব গাবতলী-সাভার-নবীনগর চার লেন এক্সপ্রেসওয়েতে ২ হাজার ৮৯০ কোটি এবং খুলনা খানজাহান আলী বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। এসব প্রকল্প নীতিগত অনুমোদন এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পর্যায়ে আছে।

সূত্র জানায়, গত বছর সর্বশেষ প্রকাশিত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিপিপির পরিবেশ বাংলাদেশে তুলনামূলক পরিণত (পরিপক্ক) হলেও এখন আছে অনেক প্রতিবন্ধকতা। আরও গতিশীল এবং ব্যয় সাশ্রয়ের স্বার্থে প্রতিযোগিতামূলক নিলামে পিপিপি প্রকল্পের সংখ্যা বাড়াতে সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। সংস্থাটির ‘পিপিপি মনিটর’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ প্রকাশনায় এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে বিনিয়োগর প্রায় ৭৬ শতাংশই জ্বালানি খাতে হয়েছে। এছাড়া বন্দর খাত পিপিপি বিনিয়োগের ১২ শতাংশের বেশি আকৃষ্ট করেছে। সরকার পিপিপি বিনিয়োগ প্রতিবছর জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছানোর এবং পিপিপি পদ্ধতির অধীনে ৩০ শতাংশ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সে লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।

সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছর যুক্ত হতে যাওয়া পিপিপি প্রকল্পগুলোর মধ্যে আর কয়েকটি হলো : হাতিরঝিল-রামপুরা-বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ-আমুলিয়া-ডেমরা হাইওয়ে সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ, কক্সবাজারে সমন্বিত পর্যটন গ্রাম তৈরি এবং ঝিলমিল আবাসিক এলাকায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য সুউচ্চ আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প। এছাড়া পূর্বাচল নতুন শহরে পানি সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন,

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে সুউচ্চ আবাসিক ভবন নির্মাণ এবং চট্টগ্রামের নাসিরাবাদে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প। আরও আছে সিলেটে পাঁচতারকা মানের হোটেল ও পর্যটন কমপ্লেক্স তৈরি, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা, ধীরাশ্রম রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন একটি নতুন কনটেইনার ডিপো তৈরি, চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ ও আধুনিক রেলওয়ে হাসপাতাল নির্মাণ এবং নারায়ণগঞ্জ শহরে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম চালুকরণ প্রকল্প।