• শুক্রবার   ০১ জুলাই ২০২২ ||

  • আষাঢ় ১৭ ১৪২৯

  • || ০১ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

অসংখ্য ভয়াবহ দুর্যোগ ও বিপর্যয়েও অক্ষত হাজারো বছরের গাছটি

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ৬ মে ২০২০  

স্বমহিমায় হাজারো বছর টিকে রয়েছে জাপানের এক চেরি গাছ। কত শত বিপদ গাছটির উপর দিয়ে অতিক্রম করেছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তবুও ঠাঁই মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে চেরি গাছটি। আর বিপদের মুহূর্তে গাছটিকে দেখেই অনুপ্রাণীত হয় জাপানিরা।

জাপানের মিহারু শহরে এক হাজার বছরেরও বেশি বয়সী এই চেরি গাছটির নাম ‘তাকিজাকুরা’। তবে ‘ওয়াটারফল চেরি ট্রি’ নামেও বেশ পরিচিত। সহস্র বছর টিকে থাকা গাছটি শুধু করোনাভাইরাস মহামারিরই স্বাক্ষী নয়। ভয়াবহ অনেক মানব সৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে টিকে আছে। যুদ্ধ, মহামারি, ভূমিকম্প এবং ঝড় মোকাবিলা করে চেরি গাছটি স্বমহিমায় নিজের অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।

 

চেরি ফুল

চেরি ফুল

জাপানের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের ফুকুশিমা প্রদেশে ২০১১ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ পারমাণবিক বিপর্যয় ঘটেছিল। জাপানের উপকূলে স্মরণকালের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল ২০১১ সালের ১১ই মার্চ। এর ফলে মারাত্মক সুনামির সৃষ্টি হয়। সুনামির জন্য মিহারুর নিকটবর্তী অঞ্চল সমূহে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল। একইসঙ্গে দাইচি পারমাণবিক পাওয়ার প্ল্যান্টেরও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

যার ফলে এর আশেপাশের শহরগুলোতে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। মারত্মক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল। হাজার বছর বয়সী চেরি গাছ ‘তাকিজাকুরা’ দুর্ঘটনার শিকার দাইচি পারমাণবিক পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তবে এই দুর্ঘটনায় গাছটির কোনো ক্ষতি হয়নি। 

 

হৃদয়বান বক্তিরা গাছটি যাতে পড়ে না যায় এজন্য খুঁটি দিয়েছে

হৃদয়বান বক্তিরা গাছটি যাতে পড়ে না যায় এজন্য খুঁটি দিয়েছে

৫৩ বছর বয়সী সিদাফুমি হিরাতা মিহারুতেই বড় হয়েছেন। তিনি জীবনভর গাছটি দেখে আসছেন। হিরাতা ফুকুশিমার পারমাণবিক দুর্ঘটনার পর গাছটি পরিচর্চা করতে এসেছিলেন। তখন পরীক্ষা করে দেখেন, গাছটি অক্ষত ছিল। হিরাতা এখন মিহারু শহরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক। তাকিজাকুরা চেরি গাছটিই এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। হিরাতা প্রায়শ গাছটির পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। 

সবসময়ই তিনি গাছটিকে সুস্থ সবলই দেখেছেন। কয়েক বছর আগে হিরাতা এবং তার কর্মীদল চেরি গাছটির চারপাশ ঘিরে দিয়েছে। এছাড়াও ডালগুলোতে তারা কাঠের খুঁটি দিয়েছে যাতে প্রচণ্ড তুষারপাতেও ডালগুলো ভেঙে না পড়ে। আশেপাশের অঞ্চলে বসবাস করা এবং দেশের সাধারণ জনগণও গাছটির যথাসম্ভব যত্ন নেয়ার চেষ্টা করে। শত শত বছর ধরে তাদের পূর্বপুরুষরাও এমনটাই করেছে। 

 

হাজার বছরের সাক্ষী এই গাছ

হাজার বছরের সাক্ষী এই গাছ

ফুকুশিমার পারমাণবিক বিপর্যয়ের পর টোকিও থেকেও অনেকে গাছটির দেখভাল করতে এসেছিলেন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে জাপান করোনাভাইরাস মোকাবিলা করতে দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। সুতরাং তাকিজাকুরা চেরি গাছের ফুলের সৌন্দর্য দেখতে পর্যটকও আসতে পারছেনা।  

সিদাফুমি হিরাতার ভাষায়, চেরি গাছটিও হয়তো পর্যটকদের শূন্যতা অনুভব করছে। গাছটির সহস্রাধিক বছরের জীবনে অসংখ্য ভয়াবহ দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে এবং মোকাবিলা করে টিকে আছে।  হয়তো ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলা করেও সে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবে।

 

গাছটি দেখছে উৎসুক দর্শণার্থীরা

গাছটি দেখছে উৎসুক দর্শণার্থীরা

কাজু ওতোমো মিহারুর একজন স্থানীয় বাসিন্দা। ফুকুশিমা দুর্ঘটনার সময় তিনি শহর ছাড়ার আগে গাছটি শেষবারের মত সপরিবারে দেখতে এসেছিলেন। তিনি এই গাছটির কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পান। তিনি মনে করেন, চেরি গাছটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় প্রকৃতি অনেক শক্তিশালী এবং যে কোনো বিপর্যকর পরিস্থিতি অতিক্রম করে টিকে থাকতে পারে।  

মানব সভ্যতার জন্য যেকোনো বড় বিপর্যয়ে ঝড়, বন্যা, পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়া, ভূমিকম্প, সুনামি সহ্য করে টিকে থাকা হাজার বছর বয়সী এই চেরি গাছ মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। প্রতিবছর শীতের বিদায় বেলা ও বসন্তের আগমনে চেরি গাছকে ঘিরে জমে উঠে ব্যস্ততা। একদল শ্রমিক চেরি বাগানে প্রবেশের পথ তৈরি করার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

 

রাতেও চেরি গাছটি মুগ্ধতা ছড়ায়

রাতেও চেরি গাছটি মুগ্ধতা ছড়ায়

পর্যটকদের চলাচল সুগম করতে সুসজ্জিত করা হয় পথ। প্রতি বছরই এমন এক পথ নির্মিত হয় বিশাল চেরি গাছের পাশ দিয়ে। প্রাচীনকাল থেকেই এ গাছটি হাজারো পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে। বসন্তে গাছটির শাখাগুলো ফুলে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। তবে এ বছর করোনাভাইরাস মহামারির কারণে পর্যটকদের জন্য পথটি উন্মুক্ত করা হয়নি।