• মঙ্গলবার   ২৪ মে ২০২২ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪২৯

  • || ২২ শাওয়াল ১৪৪৩

সূরা আল আহযাব; আয়াত ১-৫

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ২৮ ডিসেম্বর ২০১৮  

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আল আহযাবের ১ থেকে ৫ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার প্রথম তিন আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

 يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ اتَّقِ اللَّهَ وَلَا تُطِعِ الْكَافِرِينَ وَالْمُنَافِقِينَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا (1) وَاتَّبِعْ مَا يُوحَى إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا (2) وَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلًا (3)

“হে নবী! আল্লাহকে ভয় করুন এবং কাফের ও মুনাফিকদের কথা মানবেন না। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (৩৩:১)     

“এবং আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়, আপনি তার অনুসরণ করুন। নিশ্চয় তোমরা যা কর, আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন।” (৩৩:২)

“আপনি আল্লাহর উপর ভরসা করুন। (আপনার) অভিভাবক ও রক্ষাকারী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” (৩৩:৩)

ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, আবু সুফিয়ানের মতো মক্কার মুশরিক গোত্রপতিরা বিশ্বনবী (সা.)কে বলেছিল, তুমি যদি আমাদের মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে কথা না বলো তাহলে আমরা তোমাদের বিরুদ্ধাচরণ বন্ধ করব এবং মানুষের মাঝে তোমার দ্বীন প্রচার করতে দেব। এর পরিপ্রেক্ষিতে এই তিন আয়াতে মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে উপদেশ দেন যে, এ ধরনের আপোষকামী প্রস্তাবের ব্যাপারে তিনি যেন সতর্ক থাকেন। তিনি যেন নিজের ধর্ম প্রচারের স্বার্থে ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে হাত না মেলান এবং কুফর ও শিরকের বিরোধিতা করা থেকে যেন কখনোই বিরত না হন।  শত্রুরা কখনো ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বন্ধ করবে না। এ ষড়যন্ত্রের বিপরীতে মুমিন মুসলমানদেরকে সব সময় আল্লাহ তায়ালার ওপর ভরসা রাখতে এবং একমাত্র তাঁর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে। কারণ, তিনি সাহায্য করতে চাইলে আর কারো পক্ষে মানুষের ক্ষতি করা সম্ভব নয়।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. দ্বীনের শত্রুদের সঙ্গে আপোষ করতে গিয়ে তাদের দাবি মেনে নেয়া তাকওয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

২. নিজেদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মুনাফিক এবং প্রকাশ্য শত্রু  কাফের পরস্পরের সঙ্গে গোপনে যোগসাজশ রক্ষা করে। কাজেই তাদের দুই দলের ব্যাপারেই সতর্ক থাকতে হবে।

৩. কাফেরদের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা না করে আমাদের উচিত ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী চলার চেষ্টা করা। এটি কাফেরদের অসন্তুষ্ট করলেও তাতে কিছু যায় আসে না।

৪. কাফের ও মুনাফিকদের অনুসরণ না করে দ্বীনি শিক্ষায় চলতে চাইলে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। এ অবস্থায় ধৈর্য ধারণ করে একমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে হবে। কারণ, মুমিনদের জন্য তিনি সর্বোৎকৃষ্ট সাহায্যদাতা আশ্রয়স্থল।

এবারে সূরা আহযাবের ৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

 مَا جَعَلَ اللَّهُ لِرَجُلٍ مِنْ قَلْبَيْنِ فِي جَوْفِهِ وَمَا جَعَلَ أَزْوَاجَكُمُ اللَّائِي تُظَاهِرُونَ مِنْهُنَّ أُمَّهَاتِكُمْ وَمَا جَعَلَ أَدْعِيَاءَكُمْ أَبْنَاءَكُمْ ذَلِكُمْ قَوْلُكُمْ بِأَفْوَاهِكُمْ وَاللَّهُ يَقُولُ الْحَقَّ وَهُوَ يَهْدِي السَّبِيلَ (4)

“আল্লাহ কোন মানুষের মধ্যে দুটি হৃদয় স্থাপন করেননি ও তোমাদের স্ত্রীগণ যাদের সাথে তোমরা যিহার কর, তাদেরকে তোমাদের জননী করেননি এবং তোমাদের পোষ্যপুত্রদেরকে তোমাদের (আসল) পুত্র করেননি। এগুলো তোমাদের মুখের কথা মাত্র। আল্লাহ ন্যায় কথা বলেন এবং (তিনিই সরল) পথ প্রদর্শন করেন।” (৩৩:৪)

এই আয়াতে মক্কার মুশরিকদের একাধিক কুসংস্কার ও ভ্রান্ত ধারণার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে: মহান আল্লাহ এসব কাজ পছন্দ করেন না; কাজেই এগুলো থেকে দূরে থাকবে। কারণ, এক অন্তরে দু’জনের প্রতি ভালোবাসা থাকা সম্ভব নয়। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে কাফের-মুশরিকদেরকে ভালোবাসার তুলনাই হতে পারে না। যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তাহলে তার একনিষ্ঠ অনুসারী হও এবং দ্বীনের শত্রুদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলো।

জাহিলিয়্যাতের যুগে মক্কার মুশরিকরা তাদের স্ত্রীদের প্রতি অসন্তুষ্ট হলে বলত: আজ থেকে তুমি আমার মায়ের মতো। এই কথা বলার পর তারা স্ত্রীদের সঙ্গে আর কোনো শারিরীক সম্পর্ক স্থাপন করত না।  অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, স্ত্রী কখনো মা হতে পারে না। এটি ছিল অন্যায় কথা যা স্ত্রীর প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বলা হতো।

সে যুগের আরেকটি খোরাফাত বা কুসংস্কার ছিল এই যে, তারা যখন কোনো বালককে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করত তখনই তাকে নিজের ছেলে বলে ভাবতে শুরু করে দিত। প্রকৃত ছেলে যেসব অধিকার পায় তাকেও তাই দিয়ে দিত। পোষ্যপুত্রকে নিজের ছেলের মতো সম্পদের উত্তরাধিকার করত তারা।  পোষ্যপুত্র মারা গেলে তার স্ত্রীকে বিয়ে করাকে পালক পিতা হারাম মনে করত। অন্যদিকে পালক পিতা মারা গেলেও তার স্ত্রীকে বিয়ে করাকে পোষ্যপুত্ররা হারাম মনে করত।

ইসলাম এসব ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং পোষ্যপুত্র ও আসল পুত্রের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেছে।  উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (সা.)’র পোষ্যপুত্র যায়েদ বিন হারেসার সঙ্গে তার স্ত্রীর তালাক হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বনবী তার স্ত্রীকে বিয়ে করেন। আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় এই বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার ফলে জাহিলিয়্যাতের যুগের ওই কুসংস্কার আরব সমাজে থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

আয়াতের পরের অংশে বলা হয়েছে, বাক চাতুরতা দিয়ে বাস্তবতাকে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। যেমন- স্ত্রীকে নিজের মায়ের মতো বলে ফেললেই তাতে বাস্তব জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে না। স্ত্রী কখনো মা হতে পারে না।

এই আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. এক অন্তরে পরস্পরবিরোধী দুটি বিষয়ের প্রতি ভালোবাসা থাকা সম্ভব নয়।  ভালোবাসা থেকে অনুসরণ ও অনুকরণের সূচনা হয়। অন্তরে নিজেকে মুমিন দাবি করে কাফেরদের অনুসরণ করা সম্ভব নয়। অবশ্য কারো অন্তরে নেফাক থাকলে সেটা ভিন্ন কথা।

২. অভিভাবকের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক একটি সহজাত ও রক্তের সম্পর্ক। রক্তের বন্ধনহীন কোনো সম্পর্ক পিতা-পুত্রের আসল সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না।

৩. ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তিতে আমাদেরকে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পের্কর আইন-কানুন তৈরি করতে হবে। অন্য কথায় ঐশী শিক্ষার বিপরীতধর্মী যেসব  আইন ও রীতি সমাজে প্রচলিত আছে তা পরিত্যাগ করতে হবে।

এবারে এই সূরার ৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

ادْعُوهُمْ لِآَبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِنْدَ اللَّهِ فَإِنْ لَمْ تَعْلَمُوا آَبَاءَهُمْ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ وَمَوَالِيكُمْ وَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ فِيمَا أَخْطَأْتُمْ بِهِ وَلَكِنْ مَا تَعَمَّدَتْ قُلُوبُكُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا (5)

“তোমরা তাদেরকে (অর্থাৎ পোষ্যপুত্রদেরকে) তাদের পিতৃ-পরিচয়ে ডাক; এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সঙ্গত। যদি তোমরা তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান, তবে তারা তোমাদের ধর্মীয় ভাই ও বন্ধুরূপে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে তোমাদের কোন বিচ্যুতি হলে তাতে তোমাদের কোন গোনাহ নেই, তবে ইচ্ছাকৃত হলে ভিন্ন কথা। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (৩৩:৫)

আগের আয়াতের সূত্র ধরে এখানে বলা হচ্ছে, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন কোনো আচরণ করো না যাতে তোমাদের পোষ্যপুত্রকে নিজেদের পুত্রের মতোই মনে হয়। তার পিতার নাম জানা থাকলে তার নামের সঙ্গে পিতার নাম যুক্ত করে তাকে ডাকো।  যদি তার পিতার নাম জানা না থাকে তাহলে তাকে দ্বীনি ভাই কিংবা বন্ধু হিসেবে পরিচয় করিয়ে দাও যাতে  অন্যদের মধ্যে এই ভুল ধারণা না জন্মে যে, সে তোমার আসল ছেলে।

আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ তায়ালার একটি চিরন্তন আইনের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: মানুষ যদি ভুল করে কোনো পাপকাজ করে ফেলে তাহলে আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেন।  কিন্তু যদি সে ইচ্ছা করে পাপকাজে লিপ্ত হয় তাহলে তাকে অবধারিত শাস্তি পেতে হবে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:

১. আমাদেরকে পিতা-পুত্রের সম্পর্ক সমুন্নত রাখতে হবে এবং পোষ্য বা পালকপুত্রের বানানো সম্পর্ককে তার স্থলাভিষিক্ত করা যাবে না।

২. এমনকি যেসব মানুষের পিতৃ-পরিচয় জানা নেই তাদের সঙ্গেও আন্তরিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। তাদেরকে কোনো অবস্থায়ই অপমান-অপদস্থ করা যাবে না।

৩. অপরাধ ও তার শাস্তি কখনো কখনো মানুষের ইচ্ছা ও জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল।