• বৃহস্পতিবার   ২৮ অক্টোবর ২০২১ ||

  • কার্তিক ১৩ ১৪২৮

  • || ২২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

গোসল করা ছিল মধ্যযুগীয়দের বিলাসিতা

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ২৫ মার্চ ২০২১  

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে কমবেশি সবাই সচেতন। রোগ ব্যাধি থেকে বাঁচতে পরিচ্ছন্ন থাকার বিকল্প নেই। পরিচ্ছন্নতার প্রধান কাজ হচ্ছে গোসল করা, চুল, হাতের নখ পরিষ্কার রাখা, ঘর পরিষ্কার করা। তবে বর্তমানে এগুলো আমাদের নিত্যদিনের কাজ হলেও মধ্যযুগ কিংবা তারও আগে এগুলো মানুষ চিন্তাই করতে পারত না। তাদের ভরসা ছিল সুগন্ধী। 

মধ্যযুগে প্রায় ১০০০ বছর ধরে পশ্চিম ইউরোপীয়রা গোসলের বিষয়টি প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। এমনকি তারা সাঁতার কাটতেও পারত না। ফরাসি ইতিহাসবিদ জুলেস মিসলেট ইউরোপের মধ্যযুগকে ‘গোসল ছাড়া ১০০০ বছর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইউরোপে কয়েক শতাব্দী ধরে গোসল ও সাঁতারের সংস্কৃতির এই অনুপস্থিতি বিশ্বের অন্যান্য অগ্রগতি থেকে তাদের ছিটকে ফেলেছিল। 

 

কাপড় ধোয়ার জন্য তারা ব্যবহার করত ছাই আর প্রস্রাব

কাপড় ধোয়ার জন্য তারা ব্যবহার করত ছাই আর প্রস্রাব

সপ্তদশ শতকে উন্নত দেশগুলোয় গোসলের অনুপস্থিতি ও অপরিচ্ছন্ন অভ্যাস রীতিমতো অস্বাস্থ্যকর ও দুর্গন্ধময় অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। ইউরোপীয়দের মনে ধারণা ছিল, গোসল করলে রোমকূপের মধ্যে দিয়ে দেহে রোগ-জীবাণু প্রবেশ করে এবং সেই কারণে তারা গোসল করতেন না। স্পেনের রানি ইসাবেল জীবনে মাত্র দুইবার গোসল করেন। যেদিন তার জন্ম হয় এবং দ্বিতীয় ও শেষবার তার বিয়ের দিন। ফ্রান্সে রাজপ্রাসাদকে বলা হয় ‘শাঁতো’। ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রাঁসোয়া ফ্রান্সজুড়ে এমন অনেক প্রাসাদ বা শাঁতো গড়েছেন। একেকটা প্রাসাদে শত শত কক্ষ। 

তবে মজার ব্যাপার হলো, এতো বড় প্রাসাদে ছিল না কোনো বাথরুম। এখন ছবির মতো এখনকার যে ঝকঝকে ইউরোপ দেখতে পান। তা একসময় ছিল বস্তির মতো। তখনকার ১০ হাজার রাজ প্রাসাদসহ কর্মচারী ও চাকরদের থাকার স্থান সবকিছুই ছিল খুবই অপরিষ্কার। এছাড়াও মধ্যযুগে যারা প্রায়ই গোসল করত তাদেরকে সমাজের ধনী শ্রেণির ব্যক্তি মনে করা হত। 

 

সুগন্ধী ছিল তাদের ভরসা

সুগন্ধী ছিল তাদের ভরসা

ইউরোপের রাস্তাঘাট এতোটাই ছিল যে, দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে মানুষ মাস্ক ব্যবহার করত। তবুও রাস্তা পরিষ্কার করত না। ঘরের যত ময়লা আবর্জনা ছিল সবই তারা রাস্তায় এনে ফেলত। হাত ধোয়ার জন্য তখন ব্যবহার হত চুন এবং কাঠের ছাই। মাঝে মাঝে তারা সাবান ব্যবহার করত। ধীরে ধীরে অবশ্য সাবান তৈরি করতে পারে তারা। এরপর এর সঙ্গে ফুলের সুগন্ধ যুক্ত করে। একবার কিছু লোক এক ধরনের সাবান তৈরি করেছিল। যেটি হাতে ঘষা দিলে চামড়া সহ উঠে আসত। ধীরে ধীরে এসব সাবান তৈরির প্রক্রিয়া পরিবর্তিত হয়ে কোমল সাবানে এসে ঠেকেছে। তবে এটিকে অনেকেই বিলাসিতা ভাবত। তাই সাধারণ জনগণ সাবান খুব কমই ব্যবহার করত। 

 

টয়লেট পেপার আবিষ্কারের আগে তারা এই লাঠি ব্যবহার করতেন

টয়লেট পেপার আবিষ্কারের আগে তারা এই লাঠি ব্যবহার করতেন

কাপড় ধোয়ার প্রক্রিয়া ছিল আরো বীভৎস। কাপড় ধুয়ে পরার বালাই তাদের কমই ছিল। তবে যখনই পরিষ্কার করার প্রয়োজন হত, তখন এক ধরনের মিশ্রণ ব্যবহার করত। যা তৈরি হত সাদা ছাই এবং প্রস্রাব দিয়ে। এটি আসলে অনেকটা ব্লিচের কাজ করত। যে কোনো রঙের পোশাককে এটি সাদা করে ফেলত। এর মানে হচ্ছে যখনই তাদের কাপড়ের রং অতিরিক্ত ময়লার কারণে পরিবর্তন হয়ে যেত, তখন তারা রং পরিবর্তন করতেই এই কাজ করত। 

 

চারদিকে ছিল ময়লা আবর্জনার স্তূপ

চারদিকে ছিল ময়লা আবর্জনার স্তূপ

সেসময় ইউরোপীয়দের কাছে রাখঢাক বলে কিছু ছিল না। যেকোনো জায়গায় সবার সাম্নেই তারা উলঙ্গ হয়ে যেত। গোসল করা কিংবা মলমূত্র ত্যাগ করার কাজ সেরে নিত। মধ্যযুগে টয়লেট পেপারের কোনো বালাই ছিল না। এসময় তারা লাঠিযুক্ত এক ধরনের স্পঞ্জ ব্যবহার করত। কেননা সেসময় টয়লেট পেপার আবিষ্কারই হয়নি। 

 

নারীরা মাথায় এক ধরনের টুপি পরতেন

নারীরা মাথায় এক ধরনের টুপি পরতেন

এখনকার সময়ে নারীদের চুলে বিভিন্নভাবে কাটা ফ্যাশন হলেও তখন ছিল এর পুরো উল্টা। মধ্যযুগে ইউরোপীয় নারীরা সারা জীবনে হয়তো এক থেকে দুইবার চুল কেটেছে। আর চুল ধোয়া ছিল তাদের কাছে বাৎসরিক কাজ। তবে এই যুগের শেষের দিকে এসে প্রতি শনিবার নারীরা চুল ধুতেন। তবে চুল বেঁধে রাখতেন সবসময়। আর মাথায় পরতেন এক ধরনের টুপি। যা তাদের চুল পুরোপুরি ঢেকে রাখতে পারত। তবে উকুন ছিল তাদের জন্য বিরাট এক সমস্যা। পুরুষদের জন্য দাড়ি কাটা বা চুল কাটার প্রবণতা ছিল খুবই কম। তারা শুধুমাত্র মাথার মাঝখানটুকু শেভ করত। আর বাকিচুল সন্ন্যাসীদের মতো অনেক বড় বড় থাকত। 

 

সারাক্ষণ মাতাল অবস্থায় কাটাত মধ্যযুগীয় ইউরোপীরা

সারাক্ষণ মাতাল অবস্থায় কাটাত মধ্যযুগীয় ইউরোপীরা

মানব বর্জ্য শহরের বাইরে ফেলার ব্যবস্থা করা হয় অনেক পরে। এর আগে যেখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত। এতে শহরময় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে থাকত। যা ছিল তাদের জন্য খুবই অসবাস্থ্যকর। পরে এগুলো শহরের বাইরে ফেলার ব্যবস্থা করা হত। তবে ড্রেনের ঢাকনা দিতে ভুলে গিয়েছিল তারা। ফলে অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। রাজা রানিরা তাদের মল ফেলার জন্য চাকর নিয়োগ দিতেন। কেননা সেসময় প্রাসাদে কোনো টয়লেট ছিল না। তারা একটি মখমল দিয়ে তৈরি বাক্সে তাদের কাজ সারতেন। এরপর চাকর তা বাইরে ফেলে আসত। 

 

দাঁত পরিষ্কার করতে ইউরোপীয়রা ব্যবহার করতেন এই ধরনের চামচ

দাঁত পরিষ্কার করতে ইউরোপীয়রা ব্যবহার করতেন এই ধরনের চামচ

দাঁত মাজার ব্যাপারটি তখনকার ইউরোপীয়রা জানতই না। তারা এক ধরনের চামচ ব্যবহার করতে দাঁত পরিষ্কার করার জন্য। আর কানের জন্য ছিল টিউব টাইপ একটি জিনিস। মধ্যযুগে ইউরোপে চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল খুবই সীমিত। নারীদের জন্য কোনো চিকিৎসা ছিল না। ব্যথার জন্য সামান্যই কিছু ওষুধপত্র ব্যবহার করতেন তারা। সবসময়ই মানুষেরা বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগতেন। অনেকেই ধারণা করেন ইউরোপীয়দের নোংরামী এমন পর্যায় গিয়েছিল যে, সারা শহর ইঁদুরে ভরে গিয়েছিল। আর সেখান থেকেই প্লেগ রোগ ছড়াতে শুরু করে।