• শনিবার ২৫ মে ২০২৪ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১০ ১৪৩১

  • || ১৬ জ্বিলকদ ১৪৪৫

জাবি: ছিনতাই থামছে না, দায় কার?

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ৩ জুন ২০২৩  

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ছিনতাই থামছে না কোনোভাবেই। ক্যাম্পাস এরিয়ার আশেপাশে ছিনতাই দিনের পর দিন বেড়েই চলছে। ছিনতাইয়ের কাজে জড়িতরা ক্যাম্পাসকে নিজেদের ‘লুকানোর মাধ্যম’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা অনবরত ঘটতে থাকায় শিক্ষার্থীরা ভুগছেন নিরাপত্তাহীনতায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এলাকায় টহলরত সাভার হাইওয়ে থানার পুলিশ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের এরিয়ার মধ্যে না। তবে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে টহলের সময় প্রায়ই দেখা যায় ছিনতাইকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীরের ভিতর আশ্রয় নিয়ে থাকে। সাধারণত বেশিরভাগ ছিনতাই হয় সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টার মধ্যে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এসব ছিনতাইয়ের ঘটনার সাথে শিক্ষার্থীরা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে জানান মিজান। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে ক্যাম্পাসে ছিনতাই তেমন হয় না, আগে হলেও এখন সেটার হার অনেকটা কমে আসছে। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছিনতাইয়ের হার আগের চেয়ে কমেনি বরং বেড়েছে। বাড়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের দায় রয়েছে। কারণ, কর্তৃপক্ষ এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী অনিক আহমেদ বলেন, “ছিনতাইয়ের স্বীকার ক্যাম্পাসে আমিও হয়েছিলাম। কিন্তু এটার কোনো সমাধান হবে না দেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বা অন্য কারও কাছে কোনো অভিযোগ দেইনি।”

অভিযোগ না দেওয়ার কারণ হিসেবে এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, “ইতিপূর্বে কর্তৃপক্ষের কাছে অনেক অভিযোগ গেলেও তারা কোনো সমাধান দিতে পারেনি বলে অনেকের সাথে কথা বলে জেনেছি, সেজন্য আমিও অভিযোগ দিতে চাইনি।”

এসব ঘটনা সমাধান না হওয়ায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেন। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখা শিক্ষার্থীদের ছিনতাইয়ের ব্যাপারে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাদের ভাষ্যমতে, ছিনতাইয়ের ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে প্রশাসন।

এ ব্যাপারে প্রধান কর্মকর্তা সুদীপ্ত শাহীন বলেন, “মূল ক্যাম্পাসে বর্তমানে ছিনতাই প্রায় নেই বললেই চলে, প্রশাসন এ বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীর সংলগ্ন এলাকায় ছিনতাই হলে এর দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিবে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ছিনতাইকারীরা ছিনতাই করার পর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আশ্রয় নেয়। বাইরের বিষয়গুলো সাভার হাইওয়ে থানা পুলিশ দেখার কথা।”

তিনি আরও বলেন, “ক্যাম্পাসে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে প্রবেশকৃত শ্রমিকদের অবাধ চলাফেরা, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলুদ পোশাক ও নম্বরপ্লেটবিহীন রিকশা প্রবেশ করায় এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের জনপদ বেশিরভাগই গার্মেন্টস কর্মী ও স্বল্প আয়ের শ্রেণি, যাদের অধিকাংশ অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত। তাদের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে অসাধু উপায়ে উপার্জন করতে গিয়ে ছিনতাইর সাথে যুক্ত হয়। বিশ্ববিদ্যালযের শিক্ষার্থীরাও তাদের অধিকারের অপব্যবহার করছে এবং নিজেদের সুবিধার্থে নিয়ম-কানুন ভাঙছে। যার রেশ ধরে কালক্রমে তারাও নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলছে।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, “কোনো শিক্ষার্থী যদি আগে থেকে আঁচ করতে পারে বা অনিরাপদবোধ করে তাহলে যত দ্রুত সম্ভব প্রক্টরিয়াল বডিকে অবগত করতে পারে। প্রক্টরিয়াল বডি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, প্রয়োজন হলে নিরাপত্তা অফিসের সাহায্য নেবে।”

বহিরাগতদের চলাফেরা বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, “তাদের চলাফেরার সময় নিয়ে অফিশিয়াল কোনো ঘোষণা নেই, তবে বর্তমানে বহিরাগতদের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর কোনো বহিরাগতকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না।”

গার্ডের অপর্যাপ্ততা, অদক্ষতা ও প্রশিক্ষণের সংকটের বিষয়টি এসময় স্বীকার করেন প্রক্টর। তিনি বলেন, “নতুন আরও গার্ড নিয়োগের কাজ চলছে। শিগগিরই নিয়োগ সম্পন্ন হবে।” তবে প্রশাসনের ‘গড়িমসিকে’ দায়ী করেছেন ক্যাম্পাসের ছিনতাইয়ের স্বীকার হওয়া শিক্ষার্থীরা। তাদেরই একজন ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াহিয়া জিসান। তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর এরকম ঘটনা নিয়মিত আকার ধারণ করেছে। আমি নিজে এর স্বীকার হয়েছিলাম। মীর মশাররফ হোসেন হলের রাস্তায় কিছুদিন আগে ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছিলাম। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা রয়েছে। দিনের পর দিন এসব ঘটনা ঘটছে অথচ কৃর্তৃপক্ষ তাদের সিকিউরিটি গার্ড কিংবা গেটগুলোতে সিসি ক্যামেরা ইত্যাদির প্রতি জোর দিচ্ছে না।”

এইসব ঘটনাগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দিকে দায় দিতে চান এই ভুক্তভোগী। প্রশাসনের পদক্ষেপ না নেওয়ার ফলেই এসব ঘটনা দিনের পর দিন বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ক্যাম্পাস সংলগ্ন এলাকাতে বেশ কিছু ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। ইদানিং হলগুলো থেকে সাইকেল চুরির অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে বলেও জানা গেছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এসব ঘটনা সংবাদ আকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং প্রশাসন জড়িত শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার কিংবা অন্যান্যদের শাস্তির আওতায় আনতে সক্ষম হয়নি।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিজেদের বিষয়গুলো সুন্দর করে রাখতে নিজেদেরই সচেতন হওয়া উচিত। এখন পর্যন্ত যেসব জায়গায় সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে সেসব জায়গায় পুলিশী পাহাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করব।”