• রোববার ২৬ মে ২০২৪ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪৩১

  • || ১৭ জ্বিলকদ ১৪৪৫

মানিকগঞ্জে ১১৪০ টাকার গ্যাস ১৫০০ টাকায় বিক্রি!

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩  

মানিকগঞ্জে লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকার অজুহাত দেখিয়ে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা ১১৪০ টাকার গ্যাস (১২ কেজি) ভোক্তাদের কাছে কোম্পানিভেদে ১৩শ থেকে ১৫শ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার গ্যাস বিক্রেতা ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত কয়েক বছর যাবৎ মানিকগঞ্জে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহকৃত গ্যাসের বেশ সংকট রয়েছে। এতে মানিকগঞ্জ সদরসহ গোটা উপজেলাবাসী এলপিজি গ্যাসের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। দিনদিন সম্প্রসারিত হচ্ছে এলপিজির বাজার। কিন্তু কোনভাবেই যেন এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। এটি মূলত আমদানি নির্ভর একটি পণ্য। রান্নার কাজে প্রধানত মিথেন গ্যাস ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মিথেন অতি দাহ্য পদার্থ হওয়ায় এর সঙ্গে প্রোপেন ও বিউটেনের সংমিশ্রণে উচ্চচাপে সিলিণ্ডারজাত করা হয়। ফলে ভোক্তার জ্বালানি খরচ সাশ্রয় হয়। মানিকগঞ্জ জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আগস্ট মাসে ১২ কেজির প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করেছিল ১১৪০ টাকা।

ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরি বাসস্ট্যাণ্ডের মেসার্স দেশ এণ্টারপ্রাইজের মালিক মো. লোকমান মোল্লার সাথে এ বিষয়ে কথা হলে তিনি জানান, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য দাম নেয়া হচ্ছে ১৩শ থেকে সাড়ে ১৩শ টাকা।

সরকার নির্ধারিত দামের কথা জিজ্ঞেস করলে মোল্লা বলেন, সরকার দাম নির্ধারণ করেছে ঠিকই, কিন্তু সরকার তো আমাদের গ্যাস দেয় না। লোকমান মোল্লার ম্যানেজার দীলিপ কুমার সাহা বলেন, কোম্পানির কাছ থেকে ১১৯২ টাকায় আমাদের গ্যাস কিনতে হয়। সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি করলে আমাদের লোকসান গুনতে হবে।

মানিকগঞ্জ সদর এবং বিভিন্ন উপজেলার ভোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাসের দাম বাড়ানোর কৌশল হিসেবে গত কয়েক মাস যাবৎ ডিলারদের পক্ষ থেকে কৃত্রিম সংকটের কথা বলা হচ্ছে। আর এই সংকটকে পুঁজি করে গ্যাসের দাম নিজেদের ইচ্ছামতো বৃদ্ধি করছেন ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা।

মহাদেবপুরের গ্যাস বিক্রেতা মো. লিয়াকত মুন্সি জানান, তাঁর দোকানে গ্যাস নেই। চার-পাঁচটি খালি সিলিন্ডার রয়েছে। ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১৪০০ টাকা নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এ বাজারের অপর গ্যাস বিক্রেতা কালিপদ দে বলেন, গত কয়েকদিন আগে বসুন্ধরা কোম্পানির গ্যাস ১৬-১৭শ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন নিলে ১৫শ টাকা রাখা যাবে। এ বাজারের গ্যাস বিক্রেতা মিজান ও টুটুলও একই রকম দামে গ্যাস বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে।

শিবালয় উপজেলার উথলী বাজারের ডিলার আবু বক্কর জানান, আমি ওমেরা, পেট্রো, জিগ্যাস, বেক্সিমকো গ্যাসের ডিলার। বর্তমানে আমরা বেক্সিমকো বিক্রি করছি ১৩৮০ টাকা, বাকিগুলো ১২৮০ টাকা (পাইকারি দর)। এই দাম আমি একা নিচ্ছি না, মানিকগঞ্জ জেলায় বাকি যারা ডিলার রয়েছেন তাদের অনেকেই আরও বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে অভিযোগ তার।

আবু বক্করের মাধ্যমে জানা যায়, মানিকগঞ্জ সদরে রয়েছেন খোরশেদ আলম, গড়পাড়ায় আওলাদ হোসেন, ঘিওরের বানিয়াজুড়িতে লোকমান, জলিল, লিটন, লাবলুু, দৌলতপুরে রফিক, হরিরামপুরের কুটির বাজারে লিটন এবং শিবালয়ের জাফরগঞ্জ বাজারে রয়েছেন মাহবুব মোল্লা। সব মিলিয়ে মানিকগঞ্জ জেলায় প্রায় ২০জন ডিলার রয়েছেন।

তিনি আরও জানান, সরকার প্রদত্ত রেটের সাথে তাদের বনিবনা হচ্ছে না। কোম্পানি ডিও রেট দিয়েছে ১৩৩৪ টাকা। লোকবল এবং পরিবহন খরচ বাবদ বেশ টাকা খরচ হয়। এ কারণে, গ্যাসের দাম একটু বাড়তি নিচ্ছি। প্রতিমাসে আমাদের চাহিদা ৬ হাজার পিচ সিলিণ্ডার, কিন্তু আমরা পাচ্ছি মাত্র দেড় হাজার পিচ।

জাফরগঞ্জ বাজারের বসুন্ধরা গ্যাসের ডিলার মাহবুব জানান, নতুন রেট আসলে দাম জানাতে পারবো। এখন আমাদের কাছে গ্যাস নাই। এর আগে আমরা সাড়ে ১৩শ-১৪শ টাকায় বিক্রি করেছি।

একই সময়ে একই মালের দুই রকম দাম কিভাবে হয় প্রশ্নে তিনি জানান, প্রতিমাসে আমাদের চাহিদা ৩ হাজার পিচ কিন্তু আমরা পাই মাত্র ৬শ পিচ সিলিন্ডার। এ কারণে অনেক সময় আমরা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে একটু বেশি দামে বিক্রি করি। সংগতকারণে, খুচরা বিক্রিতারাও ভোক্তাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়।

হরিরামপুর উপজেলার পেদ্দারবাড়ি এলাকার এলপিজি ক্রেতা আকবর হোসেন জানান, কুঠিরবাজারের বসুন্ধরার ডিলার লিটনের কাছ থেকে ১৪শ টাকায় কিনেছি।

সরকারি নির্ধারিত দামটি জানা থাকার পরও বেশি দামে সিলিন্ডার কেনার কারণ প্রসঙ্গে আকবর বলেন, ‘আমাদের তো উপায় নেই। এর চেয়ে কম দামে কেউ বিক্রি করছেন না। আমরা এখন এলপিজি বিক্রেতাদের কাছে জিম্মি।

মানিকগঞ্জ জেলা ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক সামসুন্নবী তুলিপ জানান, বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়টি নিয়ে মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সাথে আমাদের আলোচনা হয়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে মানিকগঞ্জের এলপিজির বাজার মনিটরিং করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মানিকগঞ্জ জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল দৈনিক ভোরের কাগজকে জানান, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত দাম নেয়ার কোন সুযোগ নেই। কোন ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা যদি এর ব্যতয় ঘটায় তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।