• সোমবার   ২৬ জুলাই ২০২১ ||

  • শ্রাবণ ১০ ১৪২৮

  • || ১৬ জ্বিলহজ্জ ১৪৪২

বেড়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ২৯ ডিসেম্বর ২০২০  

বিশ্ব এখন এগোচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দিকে। এই বিপ্লবের মূলেই আছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি)। জীবনযাত্রার সর্বক্ষেত্রেই যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তির বহুমুখী ব্যবহার। বিগত কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশও তথ্য-প্রযুক্তির মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আমূল পাল্টে দিয়েছে দেশের তথ্য-প্রযুক্তির দুনিয়া। আগামী কয়েকবছর পরে প্রযুক্তির যে পরিবর্তনগুলো দেশের মধ্যে আশা করেছিলেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা করোনার ধাক্কায় সেটি ঘটে গেছে চলতি বছরেই।

অর্থনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগযোগ সবকিছুতেই লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। ঘরে বসেই চলছে অফিসের কাজ। প্রধানমন্ত্রীর মিটিং, ব্যাংক-বিমা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট কোম্পানিসহ বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করছেন বাসায় বসে। শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা, ভর্তি, চাল-ডাল-সবজীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা কোনকিছুর জন্যই বের হতে হচ্ছে না ঘর থেকে। করোনাকালে বিচারকার্যও চলেছে ভার্চুয়াল জগতে। মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে দেখা দেয়া ভাইরাস আর্শিবাদ হিসেবে এসেছে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে। করোনা পরিস্থিতিই বদলে দিয়েছে সবকিছু। আকস্মিক এক পরিস্থিতিতে বিপ্লব ঘটে গেছে প্রযুক্তির। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে স্বাগতই জানাচ্ছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা বলছেন, যেভাবে হঠাৎ করেই প্রযুক্তি নির্ভরতা বেড়ে গেছে, তাতে প্রচলিত প্রযুক্তির পরিবর্তে উচ্চগতির ফাইবার ভিত্তিক কানেকটিভিটি বৃদ্ধি করতে হবে। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও টেলিমেডিসিন সেবা, দূরশিক্ষণ, অনলাইন প্রশিক্ষণ, বাণিজ্যিক সভা-সম্মেলন প্রভৃতি খাতে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ও বিগডাটা প্রয়োগ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়াও ই-কমার্স, আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং, ভিডিও স্ট্রিমিং, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বর্ধিত চাহিদা পূরণ করতে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের ধারণ ক্ষমতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ৫-জি নেটওয়ার্ক এখন সময়ের দাবি। ৫জি এর জন্য টেলিকম কর্মকর্তাদের দক্ষ ও সক্ষম করে গড়ে তুলতে হবে। সারাদেশকে ফাইবার নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর সাবেক সভাপতি মাহবুব জামান বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে মানুষের লাইফস্টাইলে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এটা আরও পরিবর্তন হবে। মানুষ এখন ঘরে বসেই কাজ করছে, কেনাকাটা করছে। অনলাইনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। করোনার কারণে অনেক বিষয়ে যেমন ক্ষতি হচ্ছে তেমনি দেশে প্রযুক্তিখাতে নতুন একটা সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে এটা ধরতে হবে।

ই-কমার্সের সম্প্রসারণ: বিগত কয়েকবছর ধরেই দেশের কেনাকাটার ধরণে পরিবর্তন লক্ষ্যণীয় ছিল। তরুন প্রজন্ম মার্কেটের পরিবর্তে ভার্চুয়াল কেনাকাটায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলেন। তবে মার্চে করোনাভাইরাস হানা দেয়ার পর সারাদেশ যখন লকডাউনের কবলে পড়ে, তখন বাধ্য হয়েই অনলাইন কেনাকাটা শুরু হয় সারাদেশেই। রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে বসবাসকারী বেশিরভাগ মানুষ করোনাকালে ই-কমার্সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। করোনার আগে যেখানে বিশেষ উৎসব ও উপলক্ষ্যে পোষাক-পরিচ্ছদ, প্রসাধনী ইত্যাদি পণ্য কেনাকাটা হতো বেশি। করোনা শুরু পর থেকে এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বড় বাজার হয়ে ওঠেছে ই-কমার্স। বিগতবছরগুলোর তুলনায় তাই এবার ৫০ শতাংশ বেশি বিক্রি হয়েছে ই-কমার্সে। চলতি বছরে ই-কমার্স এসোসিয়েশনের অন্তর্ভূক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্কেট আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। যেটি চার বছর আগে ২০১৬ সালে ছিল মাত্র ৬৫০ কোটি টাকা। এর বাইরে এফ-কমার্স (ফেসবুক কমার্স), জেলা-উপজেলার ই-কমার্সগুলোর মার্কেটের আকারও কয়েক হাজার কোটি টাকা।

ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ই-কমার্স মার্কেটের আকার ছিল ৫৬০ কোটি টাকা, পরের বছর সেটি দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬৩২ কোটি, ২০১৮ সালে ১০ হাজার ৫০৪ কোটি, ২০১৯ সালের ১৩ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা। আর চলতি বছরে এটি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।

চালডালের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) জিয়া আশরাফ বলেন, গত কয়েক মাসে ই-কমার্সে প্রায় শতভাগ গ্রোথ হয়েছে। এটা এই শিল্পের জন্য ইতিবাচক। আশাকরি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এই গ্রোথটা থাকবে। কারণ, মানুষের এখন অভ্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে। ঘরে বসেই সব পাচ্ছেন। তাহলে কষ্ট করে কেন আর বাইরে যাবেন।

ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, করোনাকালে ই-কমার্স অনেক তাৎপর্যপূর্ণ গ্রো করেছে। যারা আগে কখনো ভাবেনি ই-কমার্স ব্যবসা করছে ট্রেন্ডের কারণে তারাও এখন এই দিকে ঝুঁকছে। লাখ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে এই খাতে। মার্কেট অনেক পরিবর্তন হচ্ছে, মার্কেটের আকার বড় হচ্ছে। তবে এটি এখনো বড় শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। গ্রাম পর্যায়ে এটি পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ই-কমার্সের উত্থানে অনেক ফিজিক্যাল শপ ভবিষ্যতে বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানান, গত ১০-১১ বছর ধরে ই-কমার্সকে আমরা যতটা জনপ্রিয় করতে চেয়েছি, করোনাকালে তার চেয়ে অনেক বেশি জনপ্রিয় করতে পেরেছি। এই সময়ে ই-কমার্সে ৫০ শতাংশের বেশি কেনাকাটা বেড়েছে।

ইন্টারনেটের ব্যবহার: করোনায় প্রযুক্তি নির্ভরতার কারণে স্বাভাবিকভাবেই ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বেড়েছে। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) এর সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক বলেন, করোনার সময় ৩৫ শতাংশ ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বেড়েছে। ব্যবহার বাড়লে ইন্টারনেটের গতি নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ বিষয়ে তিনি বলেন, এতোদিন আমাদের আইএসপির জন্য কোন গাইডলাইন ছিল না সম্প্রতি টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (বিটিআরসি) গাইডলাইন করেছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে আশা করি এক বছরের মধ্যে আমরা সেবার মান অনেক ভালো করতে পারবো।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য ও সেবা চালুর মধ্যেই সীমিত থাকবে না। প্রতিনিয়তই নিত্যনতুন ও অধিকতর উন্নত প্রযুক্তি আসবে। পুরনো পণ্যসেবাগুলোর জায়গায় হালনাগাদ পণ্যসেবা দ্রুত চালু হবে। এরই ধারাবাহিকতায় স্মার্টফোনের সক্ষমতা, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, ক্লাউড কম্পিউটিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, রিয়েল-টাইম স্পিচ রিকগনিশন, ন্যানো কম্পিউটার, ওয়্যারেবল ডিভাইস ও নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন, সাইবার সিকিউরিটি, স্মার্ট সিটিজ, ইন্টারনেট সেবা আরো উন্নত হবে। ক্লাউড কম্পিউটিং ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের বিকাশ এ দশকে বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তির দিশা পুরোদমে পাল্টে দেবে। অনলাইন কার্যক্রমে এখন যেভাবে নতুন নতুন ডিভাইস, কৌশল ও প্রবণতা ব্যাপক হারে চালু ও বিকশিত হচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের লাইফস্টাইলকে আমূল পাল্টে দেবে।

তারের জঞ্জাল নিয়ে সঙ্কট: ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস দায়িত্ব গ্রহণের পর গত আগস্ট থেকেই নগরীর সড়ক থেকে ঝুঁলন্ত তারের জঞ্জাল সরাতে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। করপোরেশনের নেতৃত্বে নগরীর বিভিন্ন সড়কে পরিচালিত হয় তার কাটা অভিযান। যদিও গত এক যুগ ধরেই এই তার অপসারণের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ, বিটিআরসি ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার ও ক্যাবল অপারেটরদের আল্টিমেটাম দিয়ে আসছে। তারপরও পূর্ব নির্দেশনা না দেয়া এবং বিকল্প ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ এনে ১৮ অক্টোবর থেকে সারাদেশে ধর্মঘটের ডাক দেয় আইএসপি ও কোয়াব (ক্যাবল অপারেটরস এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ)। পরবর্তীতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ও তথ্য-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক আইএসপিবি ও কোয়াবের সাথে বৈঠকে আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে কর্মসূচি স্থগিত করেন তাঁরা। এরপর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রের সঙ্গে বৈঠক করে মাটির নিচ দিয়ে তার নেওয়ার বিষয়ে সমঝোতা হয় এবং কর্মসূচি তুলে নেয় আইএসপিএবি। পরবর্তীতে নভেম্বরের মধ্যেই তার মাটির নিচে নিতে আল্টিমেটাম দেয় দক্ষিণ সিটি। তবে ডিসেম্বরের শেষ দিকে পর্যন্ত ধানমন্ডির একটি সড়কে তার মাটির নিচে নেয়ার কাজ শেষ পর্যায়ে।

আইএসপিএবি’র সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক বলেন, ২০ বছরের তারের জঞ্জাল চাইলেই ২ মাসে অপসারণ করা সম্ভব নয়। সরকার যদি সহযোগিতা করে তাহলে আগামী ২ বছরের মধ্যে প্রধান সড়কগুলো থেকে তার অপসারণ করা সম্ভব হবে।

এদিকে ২০২০ সালের মার্চে পুঁজিবাজারে আসার জন্য আবেদন করে মোবাইল ফোন অপারেটর রবি। ৫২৩ কোটি ৭ লাখ টাকার প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারের যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।

তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ১১ বছর ধরে তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সুপরামর্শে তথ্য-প্রযুক্তির বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির কারণে সুফল পাচ্ছে দেশের মানুষ।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, করোনাভাইরাস মোকাবেলায় এবং মানুষকে সংযুক্ত রাখতে ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের হোম ডেলিভারি , স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্য টেলিমেডিসিনসেবা, ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম, ভিডিওকনফারেন্স, অনলাইন প্রশিক্ষণ, দূর-প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, ভিডিও স্ট্রিমিং ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে ই-কমার্স, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাখাত ও আবাসিক ব্যবহারকারীদের জন্য পারস্পরিক সংযুক্তি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এ কারণে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছ। সরকার সফলভাবে এ চাহিদা পূরণ করছে।

তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে দেশের প্রায় চার হাজার ইউনিয়নে দ্রুতগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে এমন কোনো ইউনিয়ন থাকবে না যেখানে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা থাকবে না। আমাদের কেউ পিছিয়ে থাকবে না- আমাদের কেউ অফলাইন থাকবে না।