• রোববার ২৬ মে ২০২৪ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১২ ১৪৩১

  • || ১৭ জ্বিলকদ ১৪৪৫

ইটের উপর সিট তার উপর রোগী

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ৯ জুন ২০১৯  

নামেই জেলা সদর আধুনিক হাসপাতাল। হাসপাতাল শব্দটির আগে আধুনিক লেখা থাকলেও স্বাস্থ্যসেবায় নেই কোন আধুনিকতা। হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত পরিমান সিট, যাও আছে তার মধ্যে অধিকাংশ ভাঙা। সিটের পায়া না থাকায় ইট দিয়ে তার উপর বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে সিট। আর এই ভাঙা সিটের উপর অসুস্থ্য রোগী রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, ভাঙা সিটের উপর শুয়েই চিকিৎসা নিচ্ছেন অনেক রোগী। আর ওই সব ভাঙা সিটগুলোকে দাঁড় করানো হয়েছে জোড়া তালি দিয়ে। ইটের স্তর দিয়ে বানানো হয়েছে সিটের পায়া। আর বাঁশের টুকরো দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘স্যালাইন স্ট্যান্ড’। এছাড়াও বিভিন্ন ওয়ার্ডে টয়লেটের দরজা নেই। এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে মহিলা রোগীদের। সিটের সংকট থাকায় বহু রোগীকে দিনের পর দিন থাকতে হচ্ছে মেঝেতে। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের ড্রেনগুলোতে পড়ে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। যে কারণে দুর্গন্ধ এখন নিত্যদিনের সঙ্গী।

 

 

গত ২৬ মে হাসপাতালটিতে অভিযান চালায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন দুদকের কর্মকর্তারা। প্রতিনিধি দলটি হাসপাতালের বর্হিবিভাগে ডাক্তার না থাকা, নার্সদের দায়িত্ব অবহেলা ও সরকারি ওষুধ বিতরণের অনিয়ম দেখতে পান। পরে এসব সমস্যা সমাধানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের সময় দেয়া হয়।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ২০ লাখ মানুষের একমাত্র চিকিৎসার আশ্রয়স্থল হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতাল। সম্প্রতি হাসপাতালটি ১শ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। তবে ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো একশ’ শয্যা বিশিষ্ঠ হাসপাতাল ভবনেই চলছে চিকিৎসা কার্যক্রম। প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে কয়েকশ’ রোগী এই হাসপাতালে আসে। এদের মধ্যে অধিকাংশ রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেলেও গড়ে ভর্তি হচ্ছে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী। আর এতে করে হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ।

হাসপাতালটিতে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, প্যাথলজিস্ট ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংকটও রয়েছে প্রকট। বিশেষ করে এখানে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে মেডিসিন, কার্ডিওলজিস্ট ও গাইনি বিভাগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পদ। এছাড়াও হাসপাতালটিতে রয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকট। হাসপাতালে চার পাশে বেশ কয়েকটি নলকূপ স্থাপন করা হলেও বর্তমানে একটি ছাড়া সবকটি নলকূপই অকেজো। অকেজো নলকূপগুলো চালু করার কোনো উদ্যোগই যেন নেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

এ ব্যাপারে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতিন্দ্র চন্দ্র দেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ডাক্তার সংকট ও শয্যা সংকট রয়েছে। তবে এ সমস্যার সমাধান দ্রুতই করা হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে চিঠির মাধ্যমে অবগত করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, পানি সংকট দূর করতে এরই মধ্যেই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের খাবার নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালটিতে প্রতিদিন রোগীদের খাবার দিচ্ছে কোহিনুর এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। চুক্তি অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন ৩ বার করে ২৫০ জন রোগীর মধ্যে খাবার বিতরণ করা কথা। প্রতি রোগীর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে দিনে ১২৫ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে, ২৪০ গ্রাম চাল, ১৫০ গ্রাম মাছ অথবা মাংস, ১৫ গ্রাম তেল এবং ১৫ গ্রাম ডাল, পাউরুটি, কলা, ডিমসহ অন্যান্য খাবার। অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানটি ১শ’ শয্যার বাইরে কোন রোগীকে খাবার দেয় না। আবার যে খাবার দেয়া হচ্ছে তাও পর্যাপ্ত নয়। এছাড়াও পরিবেশন করা হচ্ছে তা অস্বাস্থকর ও দুর্গন্ধযুক্ত খাবার। এনিয়ে সাধারণ রোগী ও তাদের সঙ্গে আসা স্বজনদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ।

 

হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগী (বেডে থাকা) রহিদুল ইসলাম জানান, তিনি অসুস্থ হয়ে ৪দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। হাসপাতাল থেকে যে খাবার দেয়া হয় তা নামে মাত্র। বিশেষ করে রমজান মাসে এই খাবার খেয়ে রোজা রখা যায়নি। তিনি আরো জানান, এক টুকরো মাছ আর খানিকটা ঝোল সঙ্গে সামান্য সবজি আর অল্প পাতলা ডাল দিচ্ছে হাসপাতাল থেকে। তাও আবার সবসময় পান না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ফাতেমা খাতুন নামে অপর এক রোগী জানান, হাসপাতালের দেয়া খাবার খাওয়ার চেয়ে না খাওয়াই ভাল। যে অল্প খাবার দেয় তাও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। একদিনের বাসি সবজি আরেক দিন দেয়। আর একদিনের মাছের তরকারি দিয়ে তারা দুই তিন দিন চালিয়ে দেয়। তাই এ খাবার খেলে রোগ সারাতে এসে আবারো রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। তাই তিনি প্রতিদিন বাহির থেকে কিনে খাবার খাচ্ছেন বলেও জানান।

জাহিদুল ইসলাম নামে এক রোগীর স্বজন জানান, তিনি তার এক আত্মীয়কে নিয়ে দুই দিন এই হাসপাতালে রয়েছেন। দুই দিন পার হয়ে গেলেও বেড পাননি তার রোগী। তাই প্রতিদিন খাবার নিয়ে কর্মীরা এলেও তার রোগী বেড না পাওয়ায় তাকে খাবার দেয়া হচ্ছে না। তিনি আরো জানান, খাবার পরিবেশন করা কর্মীরা তাকে জানিয়েছেন বেডের বাইরে কোন রোগীকে খাবার দেয়া হয় না। অথচ চুক্তি অনুযায়ী বেডের (সিট) বাইরে থাকা দেড়শ’ জনকে প্রতিদিন খাবার দেয়ার কথা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, রোগীরা হাসপাতালে সুস্থ হওয়ার জন্য এলেও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনের ফলে তারা সবসময় স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। অনেক সময় খাবারে বিভিন্ন ধরণের পোকা-মাকড় ভেসে থাকতে দেখে অনেক রোগী এসে আমাদের কাছে অভিযোগ করেন। তবে আমরা এ বিষয়ে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বললেও তারা কর্ণপাত করছে না।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতীন্দ্র চন্দ্র দেব জানান, নিয়ম অনুযায়ী ২৫০ রোগীকেই প্রতিদিন তিন বার করে খাবার দিতে হবে। এছাড়াও তারা যদি খাবারে কোন প্রকার অনিয়ম দুর্নীতি করে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো জানান, ২৫০ রোগীর মধ্যে ১শত জন রোগীকে খাবার দেয়া হয় বিষয়টি আমার জানা নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কোহিনুর এন্টারপ্রাইজের সত্ত্বাধিকারী আজিজুর রহমান আজিজের সঙ্গে একাধিক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।