• মঙ্গলবার   ২৪ মে ২০২২ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ৯ ১৪২৯

  • || ২২ শাওয়াল ১৪৪৩

জাকাতের মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত হবে যেভাবে

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ১২ মে ২০২০  

জাকাত আরবি শব্দ। মনে রাখতে হবে এটি দান নয়, গরীবের অধিকার। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা এর উত্তম বিনিময় প্রদান করবেন। জাকাত ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের অন্যতম। অস্বীকার করার সুযোগ তো নেই-ই বরং শর্তহীনভাবে এটি ইসলামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ইসলামের অপরিহার্য বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে জাকাত। যারা সামর্থ্যবান, তাদের ওপর জাকাত আদায় করা নামাজ-রোজার মতই ফরজ।

পবিত্র কোরআন কারিমে অসংখ্যবার ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা সালাত কায়েম কর এবং জাকাত প্রদান কর।’ জাকাত শব্দের অভিধানগত অর্থ পবিত্র হওয়া, পরিশুদ্ধ হওয়া, বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি। এটা এ কারণে যে, জাকাত প্রদানের মাধ্যমে সম্পদ পরিশুদ্ধ হয়। আল্লাহ তায়ালার অপার মেহেরবাণীতে প্রদানকারীর সম্পদ বৃদ্ধি পায়।

যাদের ওপর জাকাত ফরজ :

জাকাত সবার জন্য ফরজ নয়। কেবল ওই নেসাব (সাড়ে সাততোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্নতোলা রূপা অথবা তৎসমপরিমাণ অর্থ) পরিমাণ সম্পদের স্বাধীন ও প্রাপ্তবয়স্ক মালিকের ওপর জাকাত ফরজ, যার নেসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত করেছে। এক্ষেত্রে বাসস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় যেসব সামগ্রী রয়েছে, তা নেসাবের অন্তর্ভূক্ত হবে না।

জাকাত ফরজ হওয়ার কারণ :

সম্পদশালী মাত্রই জাকাত প্রদান করতে হবে, কেননা তা মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক আরোপিত একটি ফরজ কাজ।

জাকাত প্রদান করা আল্লাহর আদেশ :

মুসলমান মাত্রই আল্লাহর আদেশ পালণে বদ্ধপরিকর। অমান্য করার সুযোগ নেই। আর যারা অমান্য করে, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন,

وَأَقِيمُواْ الصَّلاَةَ وَآتُواْ الزَّكَاةَ وَارْكَعُواْ مَعَ الرَّاكِعِينَ

‘তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর আর জাকাত প্রদান কর এবং রুকুকারীদের সঙ্গে রুকু কর।’ (সূরা : বাকারা, আয়াত :-৪৩)।

উক্ত আয়াতে সালাতের পরেই জাকাতের প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। কেননা ইবাদত দুই প্রকার। একটা দৈহিক, অপরটা আর্থিক। সালাত যেমনিভাবে দেহ-মন সুস্থ রাখে, পরিশুদ্ধ করে। তেমনি জাকাতও অর্থের পরিশুদ্ধতা আনে। অতএব, আল্লাহ তায়ালার আদেশের বাস্তবায়নে জাকাত দিতেই হবে।

(২) সম্পদ পরিশুদ্ধ হয় : জাকাত প্রদানের মাধ্যমে মানুষের সম্পদ পরিশুদ্ধ হয়। ইরশাদ হচ্ছে,

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلاَتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ وَاللّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

‘তাদের মালামাল থেকে জাকাত গ্রহণ কর যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে। আর তুমি তাদের জন্য দোয়া কর, নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনা স্বরূপ। বস্তুতঃ আল্লাহ সবকিছুই শোনেন, জানেন।’ (সূরা : তাওবা, আয়াত : ১০৩)।

(৩) জাকাত অনাদায়ের পরিণাম ভয়াবহ : আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ إِنَّ كَثِيراً مِّنَ الأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَن سَبِيلِ اللّهِ وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلاَ يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ

‘হে ঈমানদারা! পন্ডিত ও সংসারবিরাগীদের অনেকে লোকদের মালামাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে চলছে এবং আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত রাখছে। আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আজাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।’ 

يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَـذَا مَا كَنَزْتُمْ لأَنفُسِكُمْ فَذُوقُواْ مَا كُنتُمْ تَكْنِزُونَ

‘সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে (সেদিন বলা হবে), এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখার।’ (সূরা : তাওবা, আয়াত : ৩৪-৩৫)।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যাকে আল্লাহপাক সম্পদ দান করেছেন, আর সে সঠিকভাবে ওই সম্পদের জাকাত আদায় করেনি, কেয়ামতের দিন তার সম্পদকে তার জন্য একটি বিষাক্ত সাপের রূপ ধারণ করানো হবে। সে সাপকে তার গলার বেড়ীস্বরূপ পড়ানো হবে। সাপটি নিজমুখের দুই দিক দ্বারা ওই ব্যক্তিকে দংশন করতে থাকবে এবং বলবে আমি তোমার মাল, আমি তোমার জমাকৃত সম্পদ।’ (মেশকাত-১৫৫)। এ থেকে সহজেই বোঝা যায় যে, জাকাত না দেয়ার পরিণাম কত ভয়াবহ, কত জঘন্য, কত পীড়াদায়ক! এরপরেও কি মানুষ জাকাত প্রদানে দ্বিধা করতে পারে?

(৪) জাকাত মানবতার পরিচায়ক : ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ বাদ দিলেও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, মমত্ব ও সাম্যবোধের এক যুগান্তকারী নিয়ম এই জাকাত। সমাজের সম্পদশালী লোকেদের উচিৎ মানবতার তাগিতে অসহায়, দারিদ্র্য, ক্ষুধার্ত ও বস্ত্রহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আর ইসলাম এটিই বলে। তোমার বিশাল সম্পদ থেকে সামান্য অংশ গরীবদের দিয়ে দাও। তা ছাড়া দারিদ্র্যের পাশে দাঁড়ালে মনের ভেতর থেকে যে বিশাল আত্মতৃপ্তি আসে, তা পৃথিবীর অন্য কিছুতে পাওয়া যায় না।

জাকাত অস্বীকার করার পরিণাম :

জাকাত যেহেতু কোরআন-হাদিস-এজমা-কিয়াস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত, সেহেতু জাকাত অস্বীকার করা কুফরী। এজন্যই ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) তার খেলাফতকালে যারা জাকাতকে অস্বীকার করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম, যারা সালাত এবং জাকাতের মাঝে পার্থক্য সৃষ্টি করে।’

যাদেরকে জাকাত প্রদান করতে হবে :

মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনুল কারিমের সূরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে স্পষ্টাকারে মোট ৮ প্রকার মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, আর তারা হলো-

(১) ফকির। যাদের কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই। মিসকিন থেকে ভালো অবস্থান।
(২) মিসকিন বা নিঃস্ব ব্যক্তি। যার কাছে তেমন কোনো ধন-সম্পদ নেই।
(৩) আমিলুন তথা জাকাত উত্তোলন, সংরক্ষণ ও বন্টনের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তি।
(৪) মুআল্লাফাতুল কুলুব। কাফির ও নওমুসলিমকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে।
(৫) দাসমুক্তির জন্য। কৃতদাস কিংবা বন্দী মুক্তির জন্য।
(৬) ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধের নিমিত্তে জাকাত দেয়া যাবে।
(৭) ফি সাবিলিল্লাহ তথা গাজী-মুজাহিদের যুদ্ধের সরঞ্জাম কিনতে, গরীব ইলম তলবকারী শিক্ষার্থীর খরচ ইত্যাদি ফি সাবিলিল্লাহর অন্তর্ভূক্ত।
(৮) মুসাফির। মুসাফির যদিও নিজদেশে ধনী হয়, তাকে জাকাত প্রদান করা যাবে।

জাকাত আদায়ের বিবিধ উপকারিতা :

(১) গরীবের প্রযোজন পূর্ণ হয়।

(২) অভিশপ্ত পুঁজিতন্ত্রের মূলোৎপাটন হয়।

(৩) সম্পদ কুক্ষিগত করার মানসিকতাকে শেষ করে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি হয়।

(৪) মুসলমানদের সামগ্রিক শক্তি বৃদ্ধি পায়।

(৫) দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

(৬) চুরি-ডাকাতি-চিনতাইসহ সবরকম অভাবজনিত অপরাধ মূলোৎটাটিত হয়।

(৭) গরীব-ধনীর মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টি হয়।

(৮) সম্পদের বরকত ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, জাকাতের সম্পদ কমে না। (সহিহ মুসলিম- হা : ৬৭৫৭, মা :, শা :, হা: ৬৯/২৫৮৮, জামি আত তিরমিযী-হা : ২০২৯, সহিহ)।

অথাৎ- হয়তো দৃশ্যত: সম্পদের পরিমাণ কমবে, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা এই স্বল্প সম্পদের মাঝেই বেশি সম্পদের কার্যকারী ক্ষমতা দিয়ে দেবেন।

(৯) সম্পদের পরিধি বৃদ্ধি পায়। কেননা সম্পদ যখন জাকাতের মাধ্যমে অভাবীদের মাঝে বন্টিত হয়, তখন এর উপকারিতার পরিধি বিস্তত হয়। আর যখন তা ধনীর পকেটে কুক্ষিগত থাকে, তখন এর উপকারিতার পরিধিও সংকীর্ণ হয়।

(১০) জাকাত প্রদানকারী দান ও দয়ার গুণে গুণান্বিত হয়।

(১১) অন্তরে অভাবীর প্রতি মায়া-মমতা সৃষ্টি হয়।

(১২) কৃপণতার ন্যায় অসৎ গুণ থেকে নিজেকে বিরত রাখা যায়।

জাকাত নিয়ে একটি সুন্দর পরিকল্পনা :

আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, জাকাত দেবার কোনো সুনির্দিষ্টতা নেই। নেই কোনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, নেই নিয়ম-শৃংখলায় আবদ্ধ। যার যেভাবে ইচ্ছা, সেভাবে জাকাত আদায় করে থাকেন। ৫০-১০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০-২০ টাকা পর্যন্ত জাকাত দিতে দেখা যায়। একটি লুঙ্গি কিংবা শাড়ির জন্য মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। যার ফলে জাকাতের যে মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে, তা ব্যহত হচ্ছে। দারিদ্র্যের মুক্তি মিলছে না। কমছে না অভাবির সংখ্যা। অথচ জাকাতের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে দরিদ্রতা কমানো।

তো কীভাবে দিলে জাকাতের সে মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত হবে? ধরুন, কারো পাঁচ লাখ টাকা জাকাত আসলো। ওই টাকা যদি যাকে-তাকে না দিয়ে পাঁচজন চিহ্নিত গরীব লোককে দেয়া হয়, তবে পরবর্তী বছর সে লোকগুলোর আর জাকাতের প্রয়োজন হবে না। এভাবে যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিবছর জাকাত প্রদান করা হয়, তবে দেশের দরিদ্রতা অনেকাংশে কমে আসবে। সঙ্গে সঙ্গে জাকাতের যে মহৎ উদ্দেশ্য, সেটাও সাধিত হবে।

উপরোক্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি আমরা যে যার জায়গা থেকে জাকাত প্রদান করি, তাহলে দেখো যাবে জাকাতের মহৎ উদ্দেশ্য সাধিত হবে। ইনশাআল্লাহ! রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা- যাদের ওপর জাকাত ফরজ হয়েছে তাদেরকে পরিকল্পনা অনুযায়ী সুষ্ঠভাবে জাকাত প্রদানের তাওফিক দান করুন। আমিন।