• মঙ্গলবার   ০৫ জুলাই ২০২২ ||

  • আষাঢ় ২১ ১৪২৯

  • || ০৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

নিরাপদ খাদ্যশস্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে এগিয়ে বাংলাদেশ

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ৭ জুন ২০২২  

দেশে বছরে মাথাপিছু চালের চাহিদা ১৩৪ কেজি। চাল থেকে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাবার রয়েছে যা বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের দৈনিক ক্যালরির চাহিদা পূরণ করে। ভাত বাঙালির প্রধান খাদ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও কৃষিনির্ভর। দেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও এখনও আমদানিনির্ভরতা কমেনি।

তারপরও ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগ সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম। খাদ্য ও কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। মহামারি করোনাকালেও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায় বিশ্বে কৃষি ও খাদ্যের ১১ খাতে সেরা বাংলাদেশের নাম। সরকারের কৃষি অনুকূল নীতি এবং প্রণোদনায় কৃষক ও কৃষিবিদদের চেষ্টায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে চাল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে নাম ওঠেছে বাংলাদেশের। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যমতে, বর্তমানে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। যা বাংলাদেশের জন্য বিশাল এক অর্জন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় মাইলফলক বলে উলেস্নখ করেছেন বিশিষ্টজনরা। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ধরে রাখা, চালসহ কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত মাছ-মাংস রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একের পর এক স্বীকৃতি পাচ্ছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে ২০২২-২০২৪ মেয়াদে এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। মহামারি করোনা ও রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করছে জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা এফএও। বাংলাদেশের খাদ্যের কোনো সংকট হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব নিরাপদ খাদ্য দিবস। নিরাপদ খাদ্যশস্য রপ্তানিতেও এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। অথচ মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে সাত কোটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে রাষ্ট্রকে হিমশিম খেতে হয়েছে। তখন আমদানি করে খাদ্য চাহিদা মেটানো হতো। অথচ এখন দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। জলবায়ুর প্রভাবে প্রতিদিন কমেছে দুই শতাংশ আবাদি জমির পরিমাণ। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতি তো বাংলাদেশের নিয়মিত ঘটনা। দেশের ১৭ কোটি মানুষের খাবারের জোগান নিশ্চিত করা সহজ কথা নয়। এর পেছনে রয়েছে সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, কৃষি উপকরণ সহায়তা, ভর্তুকি, প্রণোদনা, দেশের ধান বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণা এবং ঘাম ঝরানো কৃষকদের নিরলস পরিশ্রম। এসবের মধ্য দিয়ে খাদ্য ঘাটতির দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার গৌরব লাভ করেছে। এরপরও বছরে প্রায় চার কোটি টন খাদ্যশস্য উৎপাদনের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ এখন খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ। বিপুল সংখ্যক মানুষের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই বড় অর্জন। স্বাধীনতার পর দেশে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে একটা নীরব বিপস্নব ঘটে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমতে থাকাসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রাকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ২০৯ জাতের বিভিন্ন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। কেবল উৎপাদন বৃদ্ধিই নয়, হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদনের দিক থেকেও অধিকাংশ দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বাংলার কৃষকরা এখানেই থেমে যাননি। একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের জন্য উদাহরণ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। এ সাফল্য সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের খাদ্য সংকটকে ইঙ্গিত করে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ একটি 'তলাবিহীন ঝুড়ি' বলে মন্তব্য করেছিলেন। এখন আর খাদ্য সংকটের দেশ নয়। বাংলাদেশ এখন খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক দেশ। ধান, গম, ভুট্টা আলু, আম বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে। সবজি উৎপাদনে তৃতীয় আর মাছ উৎপাদনে চতুর্থ অবস্থানে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগ ও জলবায়ু সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল কৃষি তথ্যের প্রচলনের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ও সরকারিভাবে কমিউনিটি রেডিও চালু হয়েছে। কৃষিকে আধুনিক করতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে জোর দিচ্ছে সরকার। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বলছে, আগামী দিনগুলোতে বিশ্বের যেসব দেশে খাদ্য উৎপাদন বাড়তে পারে, সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি। ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও বাড়ছে। ১৯৭২ সাল থেকে দেশি জাতকে উন্নত করে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল (উফশী) জাত উদ্ভাবনের পথে যাত্রা করেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ব্রি এ পর্যন্ত ৭টি হাইব্রিড ও ১০১টি ইনব্রিড জাতসহ মোট ১০৮টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ২৩ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আরও ৩৮টি উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ব্রি'র ১০৬টি (৯৯টি ইনব্রিড ও ৭টি হাইব্রিড) উচ্চ ফলনশীল আধুনিক ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ৪৬টি জাত বোরো মৌসুমের জন্য, ১২টি জাত বোরো ও আউশ উভয় মওসুম উপযোগী, ২৬টি জাত বোনা এবং রোপা আউশ মওসুম উপযোগী, ৪৫টি জাত রোপা আমন মওসুম উপযোগী, ১টি জাত বোরো, আউশ এবং রোপা আমন মওসুম উপযোগী, ১টি জাত বোনা আমন মওসুম উপযোগী। বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের কৃষি গবেষকরা। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা লবণসহিষ্ণু খরাসহিষ্ণু ও বন্যাসহিষ্ণু ধানের ২৪টি জাত উদ্ভাবন করেছেন। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের ধানের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি, গম দ্বিগুণ, সবজি পাঁচ গুণ এবং ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে দশ গুণ। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দু'টি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে তিনটি ফসল হচ্ছে। পরিশ্রমী কৃষক ও কৃষি বিজ্ঞানীদের যৌথ প্রয়াসেই এ সাফল্য। অধিক ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করায় হাজার বছরের খাদ্য ঘাটতির দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বিশ্বে দ্রম্নত খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে এমন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সবার ওপরে। বিশেষ করে খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে উদাহরণ দেখছে বিশ্ব