• সোমবার   ২৮ নভেম্বর ২০২২ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৪ ১৪২৯

  • || ০৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

মানিকগঞ্জে ঝাঁর ফুঁকে চলছে ক্যান্সারসহ সকল রোগের চিকিৎসা!

মানিকগঞ্জ বার্তা

প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২২  

ঝাঁর-ফুঁক আর পানি বাতাসা দিয়ে সর্বরোগের চিকিৎসা করছেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার ধল্লা ইউনিয়নের গান্ধারদিয়া গ্রামের অকিল ফকির ওরফে বাতাসা ফকির নামে পরিচিত এক কবিরাজ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও প্রায় ৪০ বছর ধরে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে আসছেন তিনি।

বাংলাদেশে চিকিৎসা সুবিধা বিশ্বমানের হলেও মানুষের অন্ধবিশ্বাস আর অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বাতাসা ফকির। তিনি নিজেকে সকল রোগের চিকিৎসক হিসেবে দাবি করেন। পেট ব্যাথা, বান মারা, চুরি হওয়া টাকা বা মালপত্র খুঁজে দেওয়া, জীন পরীর আছর, বিয়ে না হওয়া, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ, প্রেম-ভালোবাসার বন্ধন, বাচ্চা না হওয়া, চাকরি না হওয়া, ব্যবসা বানিজ্যের উন্নতিসহ সকল প্রকার জটিল-কঠিন রোগের চিকিৎসায় লোহার পেরাক, পানি- তৈল ও পাট পরা, তাবিজ দ্বারা নানা কৌশলে চিকিৎসা দিচ্ছেন তিনি। এমনকি মোবাইল ফোনেও চিকিৎসা দিয়ে থাকেন এই কবিরাজ।

সরেজমিন দেখা যায়, ছন ও পাটকাঠির তৈরি নির্দিষ্ট একটি ঘরে ‘আগে আসলে আগে পাবেন’ ভিত্তিতে রোগী দেখেন সত্তরোর্ধ এই কবিরাজ। প্রথম নজরানা মাত্র ১০ টাকা এবং সাথে ১০ টাকার বাতাসা। কাউকে আবার মোমবাতি-আগরবাতি বোতলজাত পানিসহ বিভিন্ন জিনিস-পত্র আনতে হুকুম করেন। সেগুলো ক্রয়ের জন্য ফকিরের বাড়িতেই রয়েছে নির্ধারিত মুদি দোকান। তার দুই ছেলে ও নাতি দোকানে বসে দেদারছে বিক্রি করছে মুদি-মনোহারীসহ কবিরাজি চিকিৎসা পণ্য। এভাবে প্রতিদিন চিকিৎসা বানিজ্য করে মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। প্রতারণার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

কথা হয় ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ থেকে আসা অষ্টাদশী মরিয়মের সাথে। তিনি বলেন, পাঁচ মাসের কোলের শিশুকে রেখে তাড়িয়ে দিয়েছে আমার স্বামী। লোকমুখে শুনেছি বাতাসা ফকিরের কাছে এলে সকল মুসকিল আসান হয়। তাই স্বামীকে ’বসে’ আনতে থানা-পুলিশে না গিয়ে ছুটে এসেছি বাতাসা ফকিরের কাছে।

মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত মাকে নিয়ে এসেছেন আলমাস সরকার (৪৫)। রাজধানীর আদাবর থেকে আসা এ যুবক বলেন, আমাদের ওখান থেকে অনেকেই চিকিৎসা নিতে বাতাসা ফকিরের কাছে আসেন। তাদের দেখাদেখি আমিও এসেছি।

অন্ধ বিশ্বাসে আলমাস-মরিয়মের মত দুর-দুরান্তের শত শত নারী-পুরুষ প্রতিদিন ভীড় জমাচ্ছেন ফকির বাড়িতে। দক্ষিন ধল্লা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রহমত আলী বলেন, প্রতারণার কৌশল হিসেবে সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার তিনি অধিক সংখ্যক রোগী দেখেন। রোগীদের নিকট থেকে ১০/২০ টাকার বাতাসা দিয়ে শুরু করলেও এক পর্যায়ে তিনি মোটা টাকা দিতে বাধ্য করেন। এছাড়া প্রতি বছর ওরসের নামে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। রাজধানীর অদুরে অবস্থিত বাতাসা ফকিরের আস্তানায় সাভার আশুলিয়া, মিরপুর, শ্যামলী, আদাবর, যাত্রাবাড়ী কেরানীগঞ্জ সহ আশ-পাশের এলাকার লোকজনের আনাগোনাই বেশী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে বলেন, বিভিন্ন পানি পরা ও ঝাঁড় ফুঁকের মাধ্যমে মূলত মানুষকে ঠকানো হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন এ ধরণের প্রতারণাকে কি ভাবে দেখছেন? নাকি তারা আদৌ অবগত নয়; তা জানা নাই। বিষয়টি যেহেতু জীবন নিয়ে খেলা তাই প্রশাসনের উচিত আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া।

মানিকগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. মোয়াজ্জেম আলী খান চৌধুরী বলেন, জনগনের সচেতনতার অভাবে ফকির কিংবা কবিরাজ দ্বারা মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ^মানের চিকিৎসা সুবিধা থাকলেও এক শ্রেনীর মানুষ এই প্রতারণার দিকে ঝুকে পড়ছেন যা কারও কাম্য নয়।